হেমন্ত সরখেল
ডালটা ভাঙা অতসী’র। যত্ন করে বড়ো করেছেন মণিমোহন। বাজার থেকে ফিরে যদি চোখে পড়ে, তুলকালাম হবে। নৃপেন দাঁতে গুরাক্ষু ডলতে ডলতে উঠোনের এখানেই এসে দাঁড়িয়েছে দেখে সুরবালা আওয়াজ দিলেন ছেলেকে,
— বাবু…
মায়ের দিকে মুখ ঘুরিয়ে ভ্রু কোঁচকাল নৃপেন। চিড়িক করে ওপরের দুটো দাঁতের ফাঁক দিয়ে তরল গলিয়ে দিল সেদিকেই। ছোটবেলা হলে থাপড়ে লাল করে দিতেন সুরো। থুতু কোনদিকে ফেলতে হয় শিখিয়ে দিতেন! জানোয়ার একটা।
— কী?
— অতশীর ভাঙা ডালখান ছাড়ায়ে আন। বাজারে গ্যাছে। আইয়া দ্যাখন মাত্র বাড়ি মাথায় তুলবো।
— কী? কোন ডাল?
— আরে ট্যালা! চোখ তুইল্যা দ্যাখ, ফুলের ডালখান।
— অ, দিতাছি।
দোআঁশ মাটির মধুর রসে ধ্যারধেরিয়ে বেড়েছে গাছটা। ভাঙা ডালটা ভেঙে কান্ডের সাথে ঝুলে আছে। হয়তো কেউ ফুল চুরি করতে এসেছিল। লাঠি দিয়ে পাড়তে গিয়ে ভেঙে ফেলেছে। আগে হলে চুরি সম্ভব ছিল না। এখন বড়ো বারুজ্জ্যে একটু দেরি করেই ওঠেন। তাই ছ্যাচ্চোরদের সুবিধা বেড়েছে। দু-তিন বারের চেষ্টায় ভাঙা ডালের মাথাটা নৃপেনের হাতে এল। হ্যাঁচকা টান মারতেই মট করে ভেঙে গেল গাছটাই, সেখান থেকে।
— যা, যা, যাঃ! এইডা কী কল্লি? হায় হায়! পোড়া কপাল আমার! গাছটারেই দিলি! এইবার আমারে আস্ত রাখবো! তেনারে চিনস্ না?
— আমি কি ইচ্ছা কইরা ভাঙছি? ভাইঙ্গা গ্যালে আমার কী করনের আছে?
— তুই হ্যাঁচকা দিয়াই সব্বোনাশডা কল্লি। কী দরকার আছিল তোর টান দেওনের?
— তাইলে মাইনষে ঐডা ছাড়াইবে ক্যামনে। ভালো হইছে, আমারে কইলা ক্যান!
উল্টো রাগ দেখিয়ে নৃপেন মুখ ধুতে বেরিয়ে গেল রাস্তার ট্যাপে। থম মেরে বসে রইলেন সুরো। এইবার উপায়? দিলুটাও ওঠেনি হয়তো ঘুম থেকে। হাল ছেড়ে ওভেনে চায়ের জল বসালেন তিনি। যা হবে ভুগে নেবেন নিত্যদিনের মতো।
ওপারের সবাই নাকি এপারে এসে জমিদারের ব্যাটা হয়ে যায়। অন্তত, মুখেন মারিতং জগতঃ বলে বিদ্রুপ তো অঙ্গের বোঝা! শিবের কপালে ঝুলে থাকা আধখানা চাঁদ। আচ্ছা, সে না হয় বানানো কথা হল। কিন্তু ব্যবহার! বিশেষ মুহূর্তে জেগে ওঠা রূপ তো রক্তের পরিচয় দ্যায়! হাবভাব পাল্টে যায়। একটু হলেও, নাড়া দ্যায় মনে। লোকটার মধ্যে তেমনই একটা রূপ বারবার ভেসে উঠতে দ্যাখেন সুরো। নামটাও যখন জলদনাদে কানে এসে ঠিকরে পড়ে, তার গাম্ভীর্য, বাতাসে ভাসা সেই কম্পন সহধর্মিণী টের পান। মনে হয়, এই সেই নায়েবি কণ্ঠ। ওজ ঝরে পড়ে স্বরে। বয়েই যায় তার লোকে কী বলল তা দিয়ে, অন্তত, তিনি বিশ্বাস করেন, নাটমন্দির, গোলা ভরা ধান, বিশাল দিঘি আর তার গভীরে দধী-চিনি নাম্নী জোড়া মাছের কেলি ভীষণ ভাবে সত্যি। শাশুড়ীও নাকি হাতে করে মুড়কি খাইয়েছেন তাদের। শুধু একবার ডাক দিলেই হল, জলের নিচে মন্থন তুলে ঘাটের লাল সিঁড়ির গা ঘেঁষে পাকা লাল মুখ তুলতো তারা। মুঠো মুঠো মুড়কি তাদের ভাগে সকাল বিকেল। তারাও শুধু বাড়ির মায়ের হাতেই খাবে। শুনতে শুনতে আফসোস হয় সুরো’র। ইস্, ঐ সময় ওখানে তিনি কেন থাকেননি! এ বাড়ি এসে মাত্র চারমাসই তো শাশুড়ীকে পেয়েছেন সুরো। ঐটুকু সময়েই তাকে বলে দিয়েছেন এই বংশে কোন ব্রত আছে, কী নেই, কেন নেই। যা আছে সেটা কীভাবে করতে হয়। পি.ইউ. পাস সুরো যতটা পেরেছেন, লিখে নিয়েছেন বঙ্গলিপির পৃষ্ঠায়। খুশি হয়েছেন শিক্ষিত বৌমার যত্ন নিয়ে গৌরব ধারণের চেষ্টায়। কথায় বাড়ে কথা, কীভাবে রায়টের মধ্যে স্বর্গ থেকে বিতারিত হয়েছেন তারা। চারদিকে হানাদারদের অট্টহাসির ফাঁকে বন্ধ খিড়কির চিলতে দিয়ে ফালি চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের মেঝেয়। ঘরের পিদিম নিভিয়ে রাখা। সবাই চুপচাপ অপেক্ষা করছে। অন্ধকারে শরীরের ছায়া যেন অশরীরীর ইশারা। বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ। রাস্তা পরিস্কার হলে রহমত খবর দেবে। আজই বেড়িয়ে পড়তে হবে। এই সব কিছু ছেড়ে। এতদিনের বসত সময়ের খেলায় চোখের আড়ালে চলে যাবে। সে কথা বলতে গেলেই শাশুড়ির মুখের বলিরেখা ভেসে যেত, আঁচল দিয়ে সে ব্যথার স্রোত বারবার মুছিয়ে দিয়েছেন সুরো। নতুন জায়গায় এসে নতুন ভাবে শুরু করা জীবনের টুকরো টুকরো যাপনকথা। তাদের গায়ে জড়ানো অমাবস্যার মতো দুঃখ। সে কথনে কখনোই দম্ভের আভাস পাননি সুরো। না ওপারের কথায়, না এপারের কথায়। সম্ভ্রান্তের লক্ষণ ফুটে উঠেছে বৃদ্ধার সে গল্পকথার নিরাসক্ত দহলিজে। ঐ কটা দিনেই আপন করে নিয়েছিলেন সুরো এ বাড়ির প্রতিটি সদস্যকে। গর্ব জন্মাতে শুরু করেছিল এই কুলকে নিয়ে তার মনে। শ্রদ্ধার আসন গভীর হলে সংস্কারও বদলে যেতে থাকে। সেটাও শুরু হল। মিশুকে ব্যবহার আর এই ‘বাটি’-র সদস্যদের পূর্ববঙ্গীয় ভাষা কখন যে সুরোর মুখে থানা গেড়েছে, তিনি বুঝতেও পারেননি। তার বাপের বাড়ির লোকেরা শুধু একটু মুখ টিপে হাসতো, এই যা। তাতে কিছু মনে করেননি কোনদিন, বরং বলতেন, তোরা পারিস? বলে দ্যাকা দিকি?
— মাসি, ফুল নিবা নিকি?
লেডিস সাইকেলে নতু দাঁড়ালো গেটের সামনের রাস্তায়। প্রাত্যহিক ফুল, বেল পাতার যোগান আজকাল ও দেয়। পাশের প্লটটা মাপালো প্রতিবেশী, দেখা গেল, ভিটেয় প্রথম পোঁতা বিল্ব অনধিকার নিয়ে তাদের সীমানায় ঢুকে বসে আছে। আমিনের ওপর জমে ওঠা ক্রোধের আগুনে পুড়ে যেতে সময় লাগেনি আর। ফলন্ত গাছটা হুড়মুড়িয়ে পড়ল উঠোন জুড়ে আর একটা বেলের আঘাতে মাথা ফাটলো মণিমোহনের। রক্তস্রোত অগ্রাহ্য করে একটাই কথা তিনি বলেছিলেন, ‘মোর জমি সাড়ে পাঁচ কাঠা, পশ্চিমা মাপে চেইন ফেইল্যা দ্যাহো, মোর গোলায় বইয়া তোমাগো রসোই হয়।’ সে ভৈরব দিঠি’র সামনে কুঁকড়ে গেছিল আমিন, পালিত’রা। জমি বাঁচলো কিন্তু বেলগাছটা গেল। সুরো’র শাশুড়ী দু হাঁটুর মাঝখান থেকে মাথা তুলে বললেন, ‘মন খারাপ কইরো না, কাউরে বাঁচাইতে কাউরে যাইতে হয়।’ শত অনুরোধ উপরোধেও এ বাড়িতে আর বেলগাছ লাগানো যায়নি। সমীরণের মা বলতো, ‘ও অ্যাকবার না কইছে, হ্যাঁ হইবো না। সতের দিন না খাইয়া ছিল আলমবাজারে ওপার থিকা আইয়া, ওরে তুমি এহনও চিন নাই নতুন বৌ।’ প্রথম প্রথম বেলপাতা পাড়ার চক্কোত্তিবাড়ির থেকেই আনতেন সুরো। কালে কালে ঘরের দুয়ারেই এল। দু’টাকার ফুল, বেলপাতা, দুব্বা দিয়ে যায় নতু প্রতিদিন। ওতেই কাজ চালান সুরো।
আওয়াজটা কানে যেতেই আরেকবার ভয়টা চেপে ধরলো। ফুল শব্দে চোখটা চলে গেল ভাঙা গাছটার দিকে। কী যে কপালে আছে আজ! মাথা নাড়তে মেয়েটা পদ্মপাতায় গৃহদেবতার শৃঙ্গার নামিয়ে রাখলো দুয়ারে।
— হাত জোড়া।
— ঠিক আছে, টাকা পরে নেব।
রান্নাঘর থেকে সামনের রাস্তাটা দেখা যায়। জামগাছের কোল ঘেঁষে বাড়ির গেট। সুরো দেখলেন, ঢুকছেন তিনি। ঝিম ধরে এল সুরোর হাঁটুতে। এবারই তো শুরু হবে! কী কুক্ষণেই যে নিপুকে ডালটা সরাতে বললেন! কী হয়েছে! এত ধিমে তালে তো হাঁটেন না! শরীর ঠিক আছে তো! উঠোনটুকু পেরিয়ে হাতের ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন গিন্নির হাতে মণিমোহন। তারপর বসে পড়লেন সিঁড়ির ওপরেই।
— একখান আশ্চর্য খবর পাইলাম, বুঝলা!
— কী!
— নয়নের নাকি তিন চুলায় কেউ কোত্থাও নাই!
— কোন নয়ন!
— তুমি গ্যাছো! অফিসের নয়ন! যে আমারে বাড়ি অব্দি ছাইড়া গ্যালো রিটায়ারমেন্টের দিন!
— ও, হেইডাই নয়ন? ও কি আজকের কথা যে মনে থাকব! আমার তো হের নামডাও মনে নাই! আমাগো ছাড়তে আইছিলেন একজন। হেনার খবর কই পাইলা?
— ক্যাশিয়ার ফোন করছিল। হঠাৎ তেনার নাম্বার দেইখ্যা আশ্চর্যই হইছি। হে ই একখান খবর শুনাইল, বড়োই অদ্ভুত!
– শুনুম, দুফুরে কইয়ো। এহন জিরাইয়া স্নানে যাও, কী আনছো?
– ট্যাংরা, কালিজিরা কাঁচা লঙ্কা দিয়া ঝোল কইরো।
– হয়, তাইলেই হইছে, বাবাগো মুখে রুচবোআনে?
– খাইলে খাইবো নাইলে নাই! ত্যানাগো মুহে বাইরের স্বাদ লাগছে, ঘরের রান্না রোচে না!
চাপা তীক্ষ্ণ স্বর মণি’র। এই স্বরটাকে খুব চেনেন সুরো। কথা না বলে রান্নাঘরের দিকে এগোলেন।
শৈশবের কথাবার্তারা মনে ঘর বসায়। কোন বয়সেই সেটা মুছে যায় না। জীবনের পথে চলতে চলতে সেই জলছবি নিয়ে নেয় স্বপ্নের রূপ। যা দেখা হয়নি, শুধু শোনাই হয়েছে, তাকে যদি আবার নতুন করে সাজানো যেত! যদি তেমন করে গোছানো যেত সংসার, ঘর-দুয়ার। মণিমোহন তেমনটাই করতে চেয়েছেন। পুজোর ঘর উঠোনের উত্তরে। পাশেই দক্ষিণমুখো বসতঘর। পূর্বে মায়ের ঘর। মস্ত এক উঠোন। তার বাউন্ডারি ঘেরা ছাতিম, বকুল, অমলতাস, দেবদারু দিয়ে। বাড়ির পেছনে পুকুর। লাল কালো শান বাঁধানো ঘাট। পুকুরের পাড়ে সার দিয়ে হিজল, শ্যাওড়া, কয়েতবেল। দক্ষিণ-পূর্বে বাগান। আম-জাম-কাঁঠাল- লিচু’র সাথে সবেদা পেয়ারা গোলাপজাম, যত ইতিহাসের দেখা পেয়েছেন পূর্বপুরুষের মুখে, জড়ো করে নিতে চেয়েছেন, জড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছেন তাদের। তবুও যেন সেইই সময়টাকে এখানে ধরে বেঁধে রাখা গেল না। কিছু একটা খেয়ে নিয়েছে সময়। সে মৌতাত আসে না। কথার গায়ে পিটুলির মতো লেগে থাকা গন্ধ যেন এ বাড়ির কোথাও নেই। তবে কি সবই বৃথা গেল! মনখারাপ হয়ে আসে মণিমোহনের।
মৌরী’র কৌটোটা হাতে করে কর্তার ঘরে ঢুকলেন সুরো। পালঙ্কে শিয়রের কোলবালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া। বন্ধ চোখের বাইরের দিক দিয়ে গড়িয়ে আসছে জল। শরীরটা কি খারাপ করেছে! তেমন তো মনে হলো না! খাবারও কম খাননি! তবে কি কাঁদছেন! কেন! ওর ঘরে আসা টের পেয়ে চোখ খুললেন। হাতের তালু দিয়ে তাড়াতাড়ি মুছে নিলেন গড়াতে থাকা জল।
– কী হইছে? কান্দো নাকি?
– নাঃ! কান্দি না, কাইন্দা কী হইবো? ভাবতাছিলাম, এই যে মনের মতো কইরা সাজাইলাম বাড়িখানা, এইডা কি ত্যামনডা হইলো? তাইলে মায়ে যে কইত, বাবায় যে কইত, হেই সুবাস এই ঘর-দুয়ার দিয়া আহে না ক্যান? সুরো, ব্যাবাক কি মিছা হইলো?
– আহা, এমন কইতাছ ক্যান? যদ্দূর পারছো, সাজাইছো তো! হগ্গলডা মা দেইখ্যা যাইতে পারেন নাই হেইডায় তুমি কী করবা? তাও তো শান্তি লইয়াই গ্যাছেন।
– মুই মায়ের কথা কই নাই। কইতাছি হেই সুবাসের কথা। জানো, একখান গন্ধ পাইতাম, হেইডা আর পাই না। তাই কষ্ট পাইতাছিলাম।
– ছাড়ন দাও, লও।
মণি’র হাতে মৌরী ঢেলে দিলেন সুরো। আস্তে আস্তে মুখ চলছে তার। রসাস্বাদন। বন্ধ চোখের পাতার নিচে তৃপ্তির অবগাহন। একটা হাঁটুর ওপরে আরেকটা পা তোলা। হেলান দিয়েই আছেন। সুরো উঠে এলেন পালঙ্কে। বাঁ দিকের বালিশটা সোজা করে তার ওপর ডান কনুই রেখে হাত রাখলেন মণি’র বুকে।
– কী কইতাছিলা ঐ ছোঁড়াডারে নিয়া তহন? এখন কও।
– আগে কও অতসী’র গাছখান–
– ছাড়ান দাও, যা গ্যাছে ফিরা আইবো না, হুদাই কথা বাড়বো।
চুপ করে রইলেন মণি। সত্যিই তো। যা যায় তা আর ফিরে আসে না। তাহলে তিনি এই নতুনের দেহে পুরোনো গন্ধই বা কেন খুঁজছেন!
– কী হইলো? কও!
নয়নকে মণি পেয়েছিলেন দু’বার। একই অফিসে। প্রোমোশনের আগে ও পরে। তখন ওর বয়সই বা কতো! পঁচিশ ছাব্বিশ হবে! জেনেছিলেন ওর বোনের বিয়ের কথা, মায়ের মৃত্যু, শ্রাদ্ধ। প্রতিবারই অনুষ্ঠানে যেতে অনুরোধ করেছে, যেতে পারেননি। ট্রান্সফারের পর ও এসে বলেছিল, এবার বিয়ে করবে। তারপর অন্যত্র চলে গেলেন কর্মসূত্রে। নতুন অফিস, নতুন সাইট, নতুন নতুন দায়িত্বে ভেসে আরও অনেকের সাথে নয়নকেও ভুলে যাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। শেষ পোস্টিং হলো আবার সেই অফিসে। উচ্চতর পদে। আবার দেখা হলো নয়নের সাথে। পুরোনো কত কথা স্মৃতির চাদর ছিঁড়ে উঠে এলো। পুরোনো স্টাফেরা বেশিরভাগই নেই। হয় ট্রান্সফার নয়তো রিটায়ার হয়ে চলে গেছেন যে যার বাড়ি। নয়নকে পেয়ে নতুন পরিস্থিতিতে একটু আশ্বস্ত হলেন মণিমোহন। সাথে নিয়ে যেতে লাগলেন সাইট, মিটিংএ। রিটায়ারমেন্টের দিনও বাড়ি অব্দি এলো। এর মাঝে অবশ্য একদিন ওর ছেলের বিয়ের খাওয়াটা অফিসের সকলেই খেলেন। ছেলের বিয়েতে নিমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও কেউ যাননি, তাই ক্যাশিয়ারকে সাথে নিয়ে সবটা অ্যারেঞ্জ করে অফিস স্টাফদের জন্য রীতিমতো ভুঁড়িভোজ করালো। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু, সকালের ফোনটা মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে মণিমোহনের। ক্যাশিয়ার জানালো নয়ন মারা গেছে। যেহেতু এখানে একাই থাকতো তাই সার্ভিসবুকে লেখা ওর বাড়ির ঠিকানায় কয়েকজনকে দিয়ে ডেডবডি পাঠানো হয়েছিল। তারা বলেছে, ওখানে নাকি এ নামে কেউ কোন দিন ছিল না।
– কও কী? এইডা ক্যামন কথা হইলো? হ্যার পোলা? বুইনের বিয়া দিছে, হ্যারা?
– কেউ নাই। কোন হানে কেউ নাই। হ্যারা থানায় অব্দি গেছিল। হ্যারাও কইছে, এইখানে এই নামে কেউ থাহে না। কোনকালে আছিল না।
– তুমি যে কইলা ঐ বুক-এ ঠিকানা ল্যাহা আছিলো?
– তহন কী আর অ্যাতো খোঁজ-খবরের দরকার আছিলো? যারা আইতো, রাইখ্যা লইতো। আপিসের বাবুরা জিগাইয়া সব লিখ্যা দিতো সার্ভিসবুকে। ত্যামনই হইছে হইবো।
– আমার তো ব্যাবাক ঘুলাইয়া যাইতাছে। একখান লোক চাকরি করে, তার বুইনরে বিয়া দিছে, মায়ের শ্রাদ্ধ করছে, পোলার বিয়ার খাওন খাওয়াইছে, হ্যার কেউ কোত্থাও নাই?
– তাইলেই বুইঝ্যা দ্যাহো! কথাখান ক্যামন হইলো!
কথা আসছে না সুরো’র মুখে। এমনও হয়! এত বড়ো মিথ্যেয় জীবন কাটাতে পারে কেউ! সে কেমন ভাবনা যা মানুষকে সুদীর্ঘ জীবন ধরে কল্পনায় বাঁচিয়ে রাখে! সকলকে পারিবারিক অনুষ্ঠানের নেমন্তন্ন করে খাওয়ায়, অথচ কেউ কোথাও নেই! নেই কারও কোন অস্তিত্ব! সুরো চোখ বুজে ভাবছিলেন। কথা শুনতে শুনতে উঠে বসেছিলেন। চোখ খুলে দেখলেন, মণি হাত দুটো বুকের ওপরে রেখে চোখ বন্ধ করে সটান শুয়ে আছেন। নিঃশ্বাস পড়ছে না নাকি! ধক্ করে উঠলো বুকটা। এই তো কথা বলছিলো, ঠ্যালা মারলেন একটা।
– ওই! কী গো!
বালিশে রাখা মাথাটা হেলে পড়লো ডানপাশে। ঘুমোচ্ছেন মণিমোহন। কল্পনা আর স্বপ্নমোড়া এক শান্তির ঘুম। চেঁচিয়ে উঠলেন সুরবালা, ‘বাবুউউউউ…’
======================

Share this content: