• রানা চক্রবর্তী

‘চর্যাপদ কেন বাংলা ও বাঙালির’
–রানা চক্রবর্তী
১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থশালা থেকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সর্বপ্রথম চর্যাগীতিগুলি আবিষ্কার করেছিলেন; এবং এরপরে ১৯১৬ সালে বা ১৩২৩ বঙ্গাব্দে এই গীতগুলি কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হওয়ার পর থেকেই চর্যাগীতিগুলিকে নিয়ে বিতর্কের শুরু হয়েছিল। কারণ, এসময় থেকেই কেউ এগুলিকে হিন্দি, তো কেউ মৈথিলী, তো কেউ আবার উড়িয়া কিংবা অসমীয়া ভাষার আদিরূপ বলে দাবি করতে শুরু করেছিলেন; এমনকি এখনো পর্যন্ত কেউ কেউ এই অলীক দাবি বজায় রেখেছেন বলেও লক্ষ্য করা যায়। মোটকথা হল যে, চর্যাগানের বিষয় এক হলেও, এর দাবিদার কিন্তু অনেক। আর এহেন অনেক দাবির মূল কারণ হল এর ভাষা। তবে চর্যার ভাষা যে আদতে প্রত্ন বাংলা—এবিষয়ে অনেক আগেই পণ্ডিতেরা বিচার বিবেচনা করে যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন, সেবিষয়ে পরে আসা যাবে। এর আগে এখানে চর্যাগানের অন্যান্য প্রসঙ্গগুলি নিয়ে কিছু কথা উল্লেখ্য, আর এগুলিকে ইতিহাসের কষ্টিপাথরে ফেলে বিচার করলেও কিন্তু এটাই দেখা যায় যে, এগুলির উপরে বাংলা ও বাঙালির দাবিই সর্বাগ্রগণ্য। এই অন্যান্য প্রসঙ্গগুলি নিম্নরূপ—
প্রথমতঃ, চর্যাগীতিগুলি যে বাংলা ও বাঙালির সম্পদ, এই দাবি বিচার করতে হলে প্রথমেই একথা মনে রাখতে হবে যে, যে যুগে এগুলি রচিত হয়েছিল, সেযুগে ‘বঙ্গাঙ্গমগধ’ বলতে গৌড়বঙ্গকেই বোঝানো হত। ঐতিহাসিকদের মতে, গৌড়বঙ্গের আয়তন তখন বৃহৎ ও এর সীমা বহুবিস্তৃত ছিল। বস্তুতঃ গৌড়বঙ্গের সীমা তখন পশ্চিমোত্তরে দ্বারবঙ্গ মিথিলা থেকে দক্ষিণে অনূপ প্রদেশ বঙ্গ, এবং পশ্চিম-দক্ষিণে কলিঙ্গ থেকে পূর্বোত্তরে কামরূপ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। অতীতে এবিষয়ে ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন যে, গৌড়েশ্বর পালরাজারা তখনকার ‘উত্তরাপথের ইতিহাসের প্রধান নায়ক’ ছিলেন। সেযুগে তাঁদের একনায়কত্বেই বর্তমানের খণ্ডিত ভূভাগে এক অখণ্ড সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এবিষয়ে সমকালীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, খৃষ্টীয় অষ্টম শতকে সমগ্র উত্তর ভারতব্যাপী মৎস্যান্যায়ের অবসান ঘটবার পরে গৌড়বঙ্গে প্রথম যে গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল, পালরাজারাই সেই গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক ছিলেন। আর এই গণতান্ত্রিক চেতনার ফলস্বরূপ তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই তখন জনাশ্রিত নতুন ভাষা, লোকায়ত সহজধর্ম এবং নতুন জীবনচেতনা বিকশিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছিল। এখানে বলাই বাহুল্য যে, এই চর্যাগীতিগুলি তখনকার এই নব প্রেরণারই এক অপূর্ব সৃষ্টি ছিল। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, পালবংশীয় রাজারা ‘পরম সৌগত’ ছিলেন। আর তাঁদের আমলে গৌড়ের ‘বজ্রাসন’ ছিল মৈত্রী (করুণা) ও সম্যক সম্বোধির (প্রজ্ঞা) যুক্তাসন; এবং গৌড়েশ্বররা ছিলেন ‘কারুণ্যরত্ন প্রমুদিত হৃদয়’। অনুরূপভাবে চর্যার মূলতত্ত্বও হল প্রজ্ঞা ও করুণার যোগ। সুতরাং, গৌড়ের বজ্রাসনের সমাশ্রয়েই বাংলার মাটিতে যে বজ্রযোগের শ্রেষ্ঠ আদর্শ ‘অনুত্তর চর্যা’র বিকাশ ঘটেছিল, একথা আলাদা করে বলবার অপেক্ষা রাখে না।
দ্বিতীয়তঃ, এসময়ের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারগুলির অধিকাংশই গৌড়বঙ্গের বরেন্দ্রভূমিতে, বিক্রমপুর অঞ্চলে ও চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এগুলির মধ্যে সোমপুর (বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পাহাড়পুর), দেবীকোট (বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুর), বিক্রমপুরী বিহার, জগদ্দল, চট্টগ্রামের পণ্ডিতবিহার এবং রাঢ়ের পাণ্ডুবিহার তখন বৌদ্ধ তান্ত্রিকতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। আর এই বিহারগুলির পৃষ্ঠপোষক ছিল তৎকালীন গৌড়ের বজ্রাসন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এসব বৌদ্ধকেন্দ্রে তখন বহু তন্ত্রগ্রন্থ সংগৃহীত, সংশোধিত ও পুর্নলিখিত তো হয়েছিলই; এবং এমনকি এগুলির উপরে ভাষ্য-টীকাও রচিত হয়েছিল। সুতরাং এই সূত্রে বৌদ্ধতান্ত্রিক সহজিয়া সঙ্গীতগুলি এসব জায়গায় রচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি লক্ষ্য করা যায়।
তৃতীয়তঃ, ঐতিহাসিকেরা এখনো পর্যন্ত চর্যাগীতির বিভিন্ন সহজ সিদ্ধাচার্যদের যে জীবনপঞ্জী সংগ্রহ করতে পেরেছেন, তাতে দেখা যায় যে, এসব সিদ্ধ সাধকরা যে দেশেই জন্মগ্রহণ করুন না কেন, তাঁদের প্রধান কর্মকেন্দ্র গৌড়বঙ্গই ছিল। যেমন—তিব্বতী ইতিহাস মতে আদি সিদ্ধাচার্য লুইপাদ রাজা ধর্মপালের করণিক ছিলেন; আর লুইপাদের শিষ্য ছিলেন সিদ্ধাচার্য দারিকপাদ—‘লুই পাঅপএ দারিক দ্বাদশ ভূঅণে লধা’ (৩৪নং চর্যা)। অন্যদিকে বৌদ্ধ ঐতিহাসিক তারানাথের মতে শবরীপাদ তৎকালীন বঙ্গের একজন নাট্যাচার্য ছিলেন। এছাড়া তিনি আরও জানিয়েছিলেন যে, ডোম্বীপাদ বা ডোম্বী হেরুক ত্রিপুরার রাজা ছিলেন। কিন্তু ডঃ সুকুমার সেন আবার মতপ্রকাশ করেছিলেন যে, ইনি একসময়ে রাঢ় দেশে বাস করেছিলেন। আর অন্যদের মতে, চর্যাগীতির টীকায় উল্লিখিত ‘লাড়ী ডোম্বীপাদ’ও খুব সম্ভবতঃ এই ডোম্বীপাদই ছিলেন। এছাড়া জালন্ধরীপাদের শিষ্য কাহ্নপাদ—অতীতের বাংলায় প্রচলিত থাকা গোপীচন্দ্রের গানের বিশিষ্ট যোগী ছিলেন। গবেষকদের মতে, তাঁর রচিত গানগুলিতে অতীতের বাংলায় প্রচলিত থাকা সিদ্ধাচার্য-গীতিকার সাদৃশ্য রীতিমত লক্ষ্যণীয়। অনুরূপভাবে চর্যাকার ভাদে, ধাম, মহিল প্রমুখ কাহ্নপাদের শিষ্য ছিলেন। আর ভুসুকুপাদ তৎকালীন ভারত-ভূখণ্ডের যে অঞ্চলেরই মানুষ হোন না কেন, তিনি যে শেষপর্যন্ত ‘বঙ্গালী’ হয়ে গিয়েছিলেন, একথা তিনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন—‘আছি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী’ (৪৯নং চর্যা)। আবার তিব্বতি তালিকা অনুসারে শান্তিপাদ ও রত্নাকর শান্তি একই ব্যক্তি ছিলেন; এবং এই রত্নাকর শান্তি যে আদতে বাঙালি ছিলেন—এবিষয়ে গবেষকদের মধ্যেও কোন দ্বিমত লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া অতীতে পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন অনুমান করেছিলেন যে, সরহপাদ ‘পূর্বদিশা’, অর্থাৎ—ভাগলপুরের অধিবাসী ছিলেন (বিস্তারিত তথ্যের জন্য রাহুল সাংকৃত্যায়ন অনূদিত ও সম্পাদিত ‘দোহাকোষ’ দ্রষ্টব্যঃ)। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, পালযুগে এই ‘পূর্বদিশা’ পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাছাড়া সরহপাদ ‘বঙ্গে জায়া’ গ্রহণ করেছিলেন—‘বঙ্গে জাআ নিলেসি’ (৩৯নং চর্যা)। এবিষয়ে উদাহরণ আর দীর্ঘ করবার দরকার নেই। আসলে চর্যাগীতির অধিকাংশ সিদ্ধাচার্যই গৌড়বঙ্গে এসে মিলিত হয়েছিলেন বলে তাঁদের রচিত সিদ্ধ সাধক সঙ্গতিগুলি যে গৌড়বঙ্গেরই সামগ্রী, এবিষয়ে কোন সন্দেহ চলে না।
চতুর্থতঃ, চর্যাগীতির মধ্যে থাকা কতগুলি অভ্যন্তরীণ প্রমাণও একথাই সমর্থন করে যে, এই গানগুলি আসলে প্রাচীন গৌড়বঙ্গেরই সামগ্রী। যেমন—চর্যাগানে দেশনাম ‘বঙ্গ’ (৩৯নং চর্যা), জাতি নাম ‘বঙ্গাল’ (৪৯নং চর্যা), এবং নারী নাম ‘পঁউআঁ’ বা পদ্মা (৪৯নং চর্যা) প্রভৃতি পাওয়া যায়। পণ্ডিতদের মতে, বাংলার পটভূমি ছাড়া এই নাম ব্যবহৃত হওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া বাংলারই অরণ্য-পর্বতবাসী আদি ‘জন’ হলেন শবর-শবরীরা। আর খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত শবরকন্যাদের দেহ-লাবণ্য বাংলার জনসমাজকে তো বটেই, এমনকি সমকালীন শাসকদেরও যে আকৃষ্ট করেছিল, ‘বল্লালচরিত’ ও গোবর্ধন আচার্যের ‘আর্যাসপ্তাসতী’র একটি শ্লোক (আর্যা নং ৪৪৬) থেকেও একথা সমর্থিত হয়। অন্যদিকে চর্যার দুটি গানেও (২৮ ও ৫০নং) এই শবরীদের প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। আর ঐতিহাসিকদের মতে—অহেরী ব্যাধ, ভোগ ও চণ্ডাল—প্রাচীন বাংলারই অন্তেবাসী সমাজ-নিন্দিত জনগোষ্ঠী ছিল। এমনকি চর্যাগানগুলিতে তৎকালীন বাংলায় উৎপন্ন দ্রব্যের প্রসঙ্গও লক্ষ্য করা যায়। যেমন—চর্যার কয়েকটি গানে ‘পাস’ বা কার্পাস ও ‘কঙ্গুচিনা’ বা কাগনির উল্লেখ রয়েছে বলে দেখা যায়। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের সাথে পরিচিত প্রায় সকলেই অবগত রয়েছেন যে, বাংলার সূক্ষ্ম কার্পাস বস্ত্র মসলিন একসময়ে বিশ্ববিখ্যাত ছিল। তাছাড়া চর্যায় যে চিনা শস্যের (গ্রাম্যভাষায় ‘চিত্রালী’) উল্লেখ পাওয়া যায়, সেটার চাষও তখন এদেশেই হত। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, খনার বচনেও কিন্তু চিনা-কাউনের উল্লেখ রয়েছে—

“যদি বর্ষে ফাল্গুনে
চিনাকাউন নগুণে।”

এসব ছাড়া চর্যার ১৭নং গানে ‘সারি’ গানের উল্লেখ পাওয়া যায়—যা বাংলার নিজস্ব লোকসঙ্গীত। বাংলার ভাটি অঞ্চলগুলিতে এখনও ‘বাইছার সারি গান’ প্রচলিত রয়েছে। তাছাড়া চর্যাগীতিতে উল্লিখিত রাগ-রাগিণীগুলির ভিতরে ‘গউড়া’, ‘গৌড়’ (গাবড়া) এবং ‘বঙ্গাল’ শব্দগুলি অত্যন্ত তাৎপর্যবোধক; আর গবেষকদের মতে এগুলি প্রাচীন গৌড়বঙ্গে উদ্ভূত নিজস্ব রাগমার্গ।
পঞ্চমতঃ, চর্যাগীতিতে নদীমাতৃক যে দেশের চিত্র পাওয়া যায়, সেটা চিরকালীন বাংলারই চিত্র। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, মহাভারতে তাম্রলিপ্ত, বঙ্গ প্রভৃতি দেশের অধিবাসীদের ‘সাগরানৃপবাসিনঃ’ (মহাভারত, সভাপর্ব, ২৯নং শ্লোক) বলা হয়েছিল; আর কালিদাসের রঘুবংশে বঙ্গীয়দের নৌ-সাধনতৎপর (রঘুবংশ, ৪.৩৬) বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। আসলে প্রাচীন বঙ্গদেশ আবহমান কাল থেকেই ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছে অনূপ (জলবহুল) ভূমি বলেই খ্যাত ছিল, এবং তখন এদেশের প্রধান অবলম্বনই ছিল নৌ-বল। তাই চর্যাগীতিতে উল্লিখিত ‘বার নাও তের পানসী’, চৌদ্দডিঙ্গা, ভাওয়াল্যা, বজরা, ভেলা প্রভৃতি যে তৎকালীন বাংলায় ব্যবহৃত হওয়া বিভিন্ন নৌকারই বিভিন্ন নাম—এবিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ লক্ষ্য করা যায় না।
এছাড়া খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর গৌড়বঙ্গের তাম্রপট্টলিতে অমর অক্ষরে ভাগীরথী নদীর উপরে নির্মিত নৌ-সেতুবন্ধের কথা—‘ভাগীরথী পথ প্রবর্তমান নানাবিধ নৌবাট সম্পাদিত সেতুবন্ধ’—খোদাই করা হয়েছিল। আর চর্যাগীতি থেকে বুঝতে পারা যায় যে বজরা নৌকার বহর (৪৯ নং চর্যা) তৎকালীন বাংলারই বিশিষ্ট নৌ-বহর ছিল। বস্তুতঃ চর্যাগানগুলি এই অনূপ বঙ্গভূমির রসেই সিক্ত ও স্নিগ্ধ; এবং বিভিন্ন চর্যায় গহন-গম্ভীর নদীর রূপ, নদী পারাপারের সঙ্কেত, নৌবাহনের বিভিন্ন পদ্ধতি তো বর্ণিত হয়েছেই; একইসাথে কেথায়ও আবার নদীর রূপকে বোধিচিত্তের কথাও বলা হয়েছে। মোটকথা হল যে, চর্যায় উল্লিখিত নদী ও নৌকার চিত্র-প্রতীকে সাধনতত্ত্বের জটিলতা ও রহস্যময়তাই রসনিবিড় হয়ে উঠেছে।
ষষ্ঠতঃ, চর্যাগীতের একাধিক চর্যায় (৯, ১২ ও ১৬নং চর্যা) গজ বা হাতির প্রসঙ্গ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। ঐতিহাসিকদের মতে, হস্তীবল প্রাচীন গৌড়বঙ্গের একটি বিশিষ্ট বল ছিল (আরো বিস্তারিত তথ্যের জন্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লিখিত ‘প্রাচীন বাংলার গৌরব’ গ্রন্থ দ্রষ্টব্যঃ); এবং কামরূপ, উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলের হাতি প্রাচীনকালে ভারতীয় যুদ্ধের চতুরঙ্গ বলের একটি প্রধান অঙ্গ বলে বিবেচিত হত। আর একারণেই এদেশের প্রাচীন তাম্রপট্টে হস্তীবলাধ্যক্ষ নামক একটি বিশিষ্ট পদের গুরুত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল; এবং খালিমপুর তাম্রপট্টে ‘করিণী-নিবন্ধন-মহাস্তম্ভ’–এর উল্লেখ পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে চর্যাগীতের ১৬নং চর্যাতেও এই হস্তীবন্ধন-স্তম্ভ—‘খম্ভাঠণা’র উল্লেখ স্পষ্টভাবেই দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে ‘হস্ত্যায়ুর্বেদ’ শাস্ত্রও প্রণীত হয়েছিল বলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। অন্যদিকে চর্যাগানে বোধিচিত্তের সাধারণ নাম হল ‘গঅরাঅ’ বা গজরাজ। আর এই গজের প্রসঙ্গে চর্যাগীতিতে ‘বাখোড়’ (দোখোট = স্তম্ভদ্বয়), ‘মঅগল’ (মদকল, ৯নং চর্যা), ‘তিনি পাট’ (তে-পাটা), ‘খম্ভা’ (খাম্বা = স্তম্ভ, ১৬নং চর্যা) প্রভৃতি শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়। এসব থেকে পরিষ্কারভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, অতীতে এই গানগুলি গৌড়বঙ্গে রচিত হয়েছিল বলেই চর্যাগীতিতে হস্তী-প্রতীকের এত প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়।
সপ্তমতঃ, গবেষকদের মতে, প্রাচীন সাহিত্যগুলিতে একটি দেশের যে চিরাচরিত ভাব লিপিবদ্ধ হয়েছিল, সেই বিশিষ্ট ভাবমুদ্রা দ্বারা একটি বিশেষ অঞ্চলের ধর্ম ও সাহিত্যকে সহজেই অন্য অঞ্চলের সাহিত্য থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। অন্যদিকে ইতিহাস বলে যে, প্রাচীনকাল থেকেই গৌড়বঙ্গ তন্ত্র ও যোগসাধনার একটি বিশিষ্ট কেন্দ্র হলেও বিহার-মিথিলা ইত্যাদি অঞ্চল কিন্তু বরাবরই আর্যধারার বাহক ছিল। তবে প্রাচীন মিথিলা অতীতে ব্রহ্মজ্ঞানচর্যার কেন্দ্র হলেও পরবর্তীকালে সেখানে ন্যায়চর্চা প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু গৌড়বঙ্গ চিরকালই তন্ত্রের দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল; এবং রত্নাকরশান্তি, প্রজ্ঞাকরমতি, অতীশ প্রমুখ তন্ত্রাচার্যরা বাঙালি ছিলেন। তাই চিরকালীন লোকায়ত যোগতন্ত্রের যে বীজ বাংলার মাটিতে মিশে গিয়েছিল, পরবর্তীকালে এদেশের প্রায় প্রতিটি ধর্মই সেই বীজের মিশ্রণে অঙ্কুরিত ও পল্লবিত হয়ে উঠেছিল। আর এই মিশ্রণের বিচিত্র প্রকাশই এখন বাঙালির নিজস্ব ধর্মীয় ও লোকায়ত সাহিত্যে দেখতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বঙ্গীয় ভাবমুদ্রার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল তান্ত্রিকতা শাস্ত্রবিধির বিরোধিতা, প্রাণধর্মের সহজ প্রকাশ, কায়সাধন, রাগতত্ত্ব ও বস্তুনিষ্ঠা। বাঙালির প্রায় প্রতিটি ধর্ম ও জাতীয় সাহিত্য এই লক্ষণে লক্ষণান্বিত হয়ে রয়েছে বলেই লক্ষ্য করা যায়। তাই এদেশে সহজ-সাধনার বিবর্তন-ইতিহাস কোনভাবেই ইতিহাসের এই মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। আর এটা বিচ্ছিন্ন নয় বলেই, যে মূল ভাববস্তু নিয়ে অতীতে চর্যাগানগুলি রচিত হয়েছিল, পূর্বপর বাংলা সাহিত্যে ও বাঙালির ধর্মচেতনায় সেটারই অবিচ্ছিন্ন যোগ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সুতরাং প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের এই গোত্রচিহ্ন দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, চর্যাগীতি আসলে প্রাচীন গৌড়বঙ্গেরই সামগ্রী।
এছাড়া ‘পরম সৌগত’ পালরাজারা মহাযান, তথা তান্ত্রিক বৌদ্ধ সহজধর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলেও, তাঁদের পরে বর্মন ও সেন রাজাদের আমলে বাংলায় শৈব, সৌর, বৈষ্ণব ইত্যাদি ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুত্থান ঘটেছিল। এরফলে বৌদ্ধ তন্ত্রসাধনার ধারা তখন মন্দীভূত হয়ে গেলেও এসব ধর্মে যে বৌদ্ধ তান্ত্রিক ধারা অনুপ্রবিষ্ট হয়েছিল, ভৈরবী চক্রানুষ্ঠান ও হঠযোগ ইত্যাদি থেকে একথা প্রমাণ করা যায়। এমনকি খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতকেও বৌদ্ধতন্ত্রের তারাদেবীর প্রভাব যে বাংলা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, একথার প্রমাণ গোবর্ধন আচার্যের আর্যাসপ্তশতীর একটি শ্লোক থেকে পাওয়া যায়, যা নিম্নরূপ—

“অতিপুজিত তারেয়ং দৃষ্টি শ্রুতিলঙ্ঘনক্ষমা নুতনু।
জিনসিদ্ধান্ত স্থিতিরিব সবাসনা কং ন মোহরতি।”
(২১নং চর্যা)

তবে এসময়ে হিন্দুধর্মের পুনরভ্যুত্থানের ফলে প্রথমতঃ বৌদ্ধ সহজ মত ও পথ শৈব চন্দ্রসূর্য মিলন-যোগ এবং শাক্ত চক্রানুষ্ঠানের ভিতরে আশ্রয় লাভ করেছিল; এবং ক্রমে অবস্থা বিপর্যয়ে বৌদ্ধশাক্তাচার তৎকালীন সমাজের নিম্নস্তরের লৌকিক সমাজের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিল। অতঃপর খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতকের শেষভাগ থেকে এদেশে তুর্ক-আফগান অভিযানের ফলে ক্ষীণপ্রভবৌদ্ধ সঙ্ঘারামগুলি ধূলিসাৎ হতে শুরু করলে বৌদ্ধরা তখন প্রাণভয়ে নেপাল-তিব্বতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন; এবং অবশেষ বৌদ্ধরা অপাংক্তেয় হিন্দু বৈশ্য সমাজে (‘বৈশ্যান্ত বৌদ্ধ ইব’—চৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটক) এবং আরও নিম্নস্তরে মিশে গিয়েছিলেন। এছাড়া এঁদের মধ্যে অনেকে তখন ইসলামধর্ম গ্রহণ করতেও বাধ্য হয়েছিলেন। এরফলে একদিকে যোগ-তন্ত্র সাধন ধারার সঙ্গে বৌদ্ধ সহজসাধনার ধারা বাঙালির লোকায়ত শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণবধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তখন যেমন সংরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে বঙ্গদেশীয় পীর-ফকিরি সাধন এবং সুফী মতবাদের ভিতরেও সহজ যোগের ধারা মিশে গিয়েছিল। আর এসব কারণেই এখন বাংলার নাথপন্থ, শৈব যোগী শাক্তাচার, মঙ্গলকাব্য, সহজিয়া বৈষ্ণব, ফকিরিসাধন এবং বাউল পদ্ধতির ভিতরে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ সহজসাধন পদ্ধতির চিহ্ন দুর্লক্ষ্য নয়।
কিন্তু এপ্রসঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে যে, কায়া সাধন ও রাগতত্ত্বের সাধন মূলতঃ যেমন হিন্দুদের নয়, তেমনি বৌদ্ধের ও মুসলমানদেরও নয়; বরং এটা এদেশের মৃত্তিকা-সম্ভব একটি অতি আদিম লৌকিক ধারা; আর এদেশের যাবতীয় সাধনপদ্ধতি সেই ধারার অধমর্ণ বলেই প্রায় সমগোত্রজ, এবং অন্যোন্য সম্পর্কযুক্ত। আসলে বাঙালি ও বাংলার ধর্মই হল চির সহজিয়া; এবং চর্যাগীতিগুলিও সেই সহজমতেরই বাহক। তাই এই সূত্রেই পরবর্তীসময়ের বাংলা সাহিত্যে ও বাংলার ধর্মে চর্যাগানের ভাবসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
এবারে চর্যাগীতির ভাষা প্রসঙ্গে আসা যাক। গবেষকদের মতে, চর্যাগানগুলির ভাষা প্রাচীন বা মধ্যভারতীয় কোন আর্য ভাষা নয়; বরং এটা তৎকালীন ভারতের পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত অপভ্রংশ ভাষার কঞ্চুকমুক্ত একটি নব্য ভারতীয় ভাষা; বা আরো ভালো করে বললে, এই ভাষাটি হল প্রাচ্য অপভ্রংশবৃন্তে সদ্য স্ফুটনোন্মুখ ভাষার একটি কুসুম-কোরক। আর একারণেই পরবর্তীসময়ে পূর্বাঞ্চলীয় ভাষাগোষ্ঠীর প্রায় সকলেই এই ভাষাকে নিজের নিজের ভাষার আদি রূপ বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু অতীতেই সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে একথা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল যে, চর্যার ভাষায় প্রচুর অপভ্রংশ উপাদান থাকলেও, এটা আসলে বাংলা ভাষারই আদিরূপ বা প্রত্নবাংলা।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, চর্যাগীতের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও অতীতে তাঁর আবিষ্কৃত দোহা, গান এবং ডাকার্ণবের দুর্বোধ্য গাথা—সবগুলিকেই ‘বাঙ্গালা’ বলেই উল্লেখ করেছিলেন। তিনি তখন এপ্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন—
“আমার বিশ্বাস, যাঁরা এই ভাষা লিখিয়াছেন, তাঁরা বাঙ্গালী ও তন্নিকটবর্তী দেশের লোক। অনেকে যে বাঙ্গালী ছিলেন, তাহার প্রমাণও পাওয়া গিয়াছে। যদিও অনেকের ভাষায় একটু-একটু ব্যাকরণের প্রভেদ আছে, তথাপি সমস্তই বাঙ্গালা বলিয়া বোধ হয়।”
এমনকি কীর্তনের গানগুলিও যে বাংলা, এটাও তিনি গানের শব্দ-সম্ভার বিশ্লেষণ করে তখন দেখিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু ২নং চর্যার পদকর্তা কুক্কুরীপাদ সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছিলেন—
“একজন পদকর্তার বাড়ী উড়িষ্যা দেশে। তাঁহার গানটিও উড়িয়া ভাষায় লিখিত। তাহাতে বাঙ্গালায় যেখানে ক্রিয়ার শেষে ‘ল’ থাকে, তাহাতে সেখানে ‘ড়’ আছে; যেমন ‘গাহিল’ ‘গাহিড়’। সে পদটিকে আমি উড়িয়া ভাষার পদ বলিয়া স্থির করিয়াছি।”
কিন্তু এসব সত্ত্বেও চর্যাগীতগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পরেই এর ভাষা নিয়ে পণ্ডিতমহলে তুমুল বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। আর এসময়েই বিজয়চন্দ্র মজুমদার মতপ্রকাশ করেছিলেন যে, চর্যার ভাষায় বাংলা, উড়িয়া ও মৈথিলী ভাষার প্রভাব থাকলেও এটা নাকি মূলতঃ হিন্দি ভাষা! এমনকি পণ্ডিত-প্রবর রাহুল সাংকৃত্যায়নও এরপরে অনুরূপ মতই পোষণ করেছিলেন (পুরাতত্ত্ব নিবন্ধাবলী)। আর অন্যদিকে কেউ কেউ আবার এই ভাষাকে উড়িয়া, অসমীয়া ও মৈথিলী ভাষার প্রাচীনতম রূপ বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীসময়ে ভাষাবিদদের বিশ্লেষণের ফলে একথাই শেষপর্যন্ত প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল যে, চর্যাগীতিতে বাংলাভাষার লক্ষণই সবথেকে সুস্পষ্ট। এর কারণ নিম্নরূপ—
(১) ভাষাবিদদের মতে, উড়িয়া ভাষার প্রধান বিশেষত্ব হল মূর্ধন্য ধ্বনির বিশুদ্ধ উচ্চারণ। এই ভাষায় ‘ণ’ ড়–এর মত উচ্চারিত হয়। অতীতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যার দ্বিতীয় গানটির ‘গাইড়’, ‘সমাইড়’ পদগুলির মধ্যে এই প্রভাব লক্ষ্য করেই এটিকে উড়িয়া ভাষার পদ বলেছিলেন। কিন্তু ডঃ সুকুমার সেন জানিয়েছিলেন যে, এগুলির বিশুদ্ধ পাঠ যথাক্রমে ‘গাইউ’ ও ‘সমাইউ’ হবে। কাজেই ধ্বনিবিচারের দিক থেকে চর্যাপদের ওপরে উড়িয়া ভাষার দাবি টেকে না। এছাড়া শব্দগঠনের দিক থেকেও ‘র’ বিভক্তি দ্বারা ষষ্ঠীর পদগঠন এবং –ইল, –ইব প্রত্যয় দ্বারা যথাক্রমে অতীত ও ভবিষ্যতের ক্রিয়াগঠনও উড়িয়া ও বাংলা ভাষার সাধারণ বিশেষত্ব। কিন্তু অ-কারান্ত শব্দে বাংলায় ‘র’ থেকে ‘এর’ হয়ে যায়। আর চর্যাগীতে এর প্রচুর দৃষ্টান্তও লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু, উড়িয়া ভাষায় ‘র’ কখনও ‘এর’ হতে পারে না; যেমন—‘শ্রাবণ মাসর কৃষ্ণা চৌথি’—এখানে অ-কারান্ত পদের পরে ‘র’ র–ই থেকে গিয়েছে।। আসলে উড়িয়া ভাষা বহুল পরিমাণে সংস্কৃতের অনুগামী হওয়ার ফলে বর্তমানের ক্রিয়াপদের ‘অন্তি’ বিভক্তিচিহ্ন উড়িয়া ভাষায় সুরক্ষিত থাকে; যথা—

“সুলক্ষণে বরকন্যা করুছন্তি ভাব।
শোভা পাউছন্তি দুঁহে রতি কামদেব॥”

কিন্তু চর্যায় কদাচিৎ ক্রিয়ার এই রূপটি রক্ষিত হয়েছে বলে দেখা যায়; যথা—‘নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী’ (১৭নং চর্যা); ‘ভণন্তি মহিণ্ডা’ (১৬নং চর্যা) ইত্যাদি। তাছাড়া –রু চিহ্ন দিয়ে অপাদানের পদ গঠন, অর্থাৎ—পরসর্গ যোগে বহুবচনের পদ গঠন বাংলা ভাষায় যেমন নেই, তেমনি চর্যাগানেও নেই; অথচ এটাই আবার উড়িয়া ভাষার একটি বিশিষ্ট লক্ষণ। আর এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই অতীতে ভাষাবিদ পণ্ডিত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন—
“In its phonetics and its forms Oriya is the most conservative of Magadhan languages and Bengali is the most advanced or farthest removed.”
এসব ছাড়া চর্যার ভাষাপ্রকৃতি বিচার করলে এটাও দেখা যায় যে, এই ভাষা যথাসম্ভব সংস্কৃতের বন্ধন-মুক্ত। অন্যদিকে ইতিহাস বলে যে, সংস্কৃত উপাদানকে তদ্ভব উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত করে গুরুচণ্ডালী ভাষা সৃষ্টির দুঃসাহস একমাত্র বাঙালিরাই দেখাতে পেরেছিলেন। সুতরাং এদিক থেকেও উড়িয়ার থেকে বাংলাভাষার সঙ্গেই চর্যাভাষার মিল বেশি।
(২) চর্যার ভাষাকে অতীতে অনেকে অসমীয়া ভাষার আদি রূপ বলেও দাবি করেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, যদিও অসমীয়া পণ্ডিতরা এখন অসমীয়া ভাষাকে একটি পৃথক ভাষা বলেই গণ্য করে থাকেন, কিন্তু তবুও ভাষাতত্ত্বের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই ভাষা খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা ভাষার সঙ্গে এক হয়েই ছিল; আর তারপরে দুটি শাখা আলাদা হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য প্রাচীনকাল থেকেই কামরূপে একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এবং তখন থেকেই মাতৃতান্ত্রিকতা, শাক্তাচার ও স্ত্রীজাতির প্রাধান্য ওই অঞ্চলের একটি প্রধান বিশেষত্বে পরিণত হয়েছিল। অতঃপর ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা ধরে এই অঞ্চলে ভোট-চীন বা তিব্বতী-ব্রহ্ম গোষ্ঠী নিজের প্রভাব বিস্তার করলে, এরফলে এখানকার ভাষাতেও অনেকটা স্বাতন্ত্র্য এসেছিল। এখনও আসামে গারো, নাগা, ভুটিয়া, খাসিয়া প্রভৃতি উপজাতির মানুষেরা বসবাস করেন। কিন্তু অহোম গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের ফলে একসময়ে কামরূপের পরিবর্তে ‘আসাম’ দেশনাম প্রচলিত হয়েছিল, এবং খুব সম্ভবতঃ অসমীয়া ভাষাও তখন থেকেই পৃথক লক্ষণে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু তবুও এরপরেও পূর্ববঙ্গের সঙ্গে আসামের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। আর একারণেই বাংলার সুকবি নারায়ণদেবের পদ্মাপুরাণ এখনও আসামে ‘সুকনানী পদ্মাবতী’ নামে পরিচিত। এছাড়া পূর্ববঙ্গের ভাষা-প্রকৃতির সঙ্গেও আসামের ভাষার প্রচুর মিল লক্ষ্য করা যায়। এবং ভাষাগত এই মিলের সূত্রেই চর্যার উপরে অসমীয়ারা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। ভাষাবিদদের মতে –র প্রত্যয় দ্বারা ষষ্ঠী বিভক্তির, ত প্রত্যয় দ্বারা সপ্তমী বিভক্তির এবং –ইল, –ইব প্রত্যয় দ্বারা যথাক্রমে অতীত ও ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়াপদ গঠনে অসমীয়া ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার মিল লক্ষ্য করা যায়। অনুরূপভাবে চর্যার ভাষাতেও এই লক্ষণ দেখতে পাওয়া যায়; যথা—‘হরিণা হরিণীর নিলঅ ণ জানী’ (৬নং চর্যা), ‘বাটত মলিল মহাসুখ সঙ্গা’ (৮নং চর্যা) ইত্যাদি। কিন্তু অন্যদিকে –র, বা –ত বিভক্তির এই যোগ বাংলা শব্দে যে রূপান্তর ঘটায়, অসমীয়া ভাষায় এর অভাব রীতিমত লক্ষ্যণীয়। এছাড়া স্বরান্ত শব্দে –এর বিভক্তির দিকে বাংলার যে প্রবণতা দেখা যায়, এমনকি ই-ঈ কারান্ত শব্দে ষষ্ঠী বিভক্ত্যন্ত পদ গঠনেও –এর দিকে যে ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়, চর্যাগানেও সেই লক্ষণই বিদ্যমান রয়েছে বলেই গবেষকরা মনে করে থাকেন। যথা—‘রুখের তেন্তলি’ (২নং চর্যা), ‘ডোম্বীএর সঙ্গে’ (১৯নং চর্যা), ‘মুষাএর চার’ প্রভৃতি। কিন্তু অসমীয়া ভাষায় –এর বিভক্তির এধরণের প্রয়োগ পাওয়া যায় না। তবে ভবিষ্যতের –ইব প্রত্যয়ের ব্যাপারে অসমীয়া ভাষায় উত্তম পুরুষে যেমন –ইম, –ম হয়; চর্যাতেও অনুরূপ দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায়; যথা—‘মারমি ডোম্বী লেমি পরাণ’ (১০নং চর্যা)। কিন্তু ভবিষ্যৎ বুঝাতে উত্তম পুরুষে –মি, –মু প্রত্যয়ের প্রয়োগ পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় যেমন দুর্লভ নয়, তেমনি পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষাতেও দুর্লভ নয়। যথা—

“এক এক করি মুই দিমু নিজ প্রাণ।
জগতে দোসর নাম না লইমু আন॥”
(দৌলত কাজী)

কিংবা—

“শুনিয়া অদ্বৈত হয় ক্রোধ অবতার।
সংহারিমু সব বলি করয়ে হুঙ্কার॥”
(বৃন্দাবন দাস)

শুধু তাই নয়, অসমীয়া ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে অতীতে দেবেন্দ্রনাথ বেজবরুয়া জানিয়েছিলেন যে, ‘ন’ অক্ষরটি অসমীয়া ভাষাতে ক্রিয়াপদের আগে ব্যবহৃত হয়, এবং বাংলায় পরে ব্যবহৃত হয়—
“… ‘ন’ আখরটো অসমীয়াই আগত বহুরায়। কিন্তু বঙ্গালীত হলে পাছ তহে রহে।” (অসমীয়া ভাষা আর সাহিত্যর বুরঞ্জী)
অনুরূপভাবে চর্যাগানে ‘ন’–এর ক্রিয়াপূর্ব নিপাত বহুজায়গায় লক্ষ্যণীয়; যেমন—‘ন জীবমি’ (৪নং চর্যা), ‘ণ জাণী’ (৬নং চর্যা), ‘ন বুঝসি’ (১৫নং চর্যা) প্রভৃতি। কিন্তু একইসাথে একথাও মনে রাখতে হবে যে, বাংলায় গদ্যেই শুধু ক্রিয়ার পরে ‘না’ বসে; আর কবিতায় এর ব্যত্যয় ঘটতে পারে। আর চর্যাগানগুলি যেহেতু কবিতা, সেহেতু কবিতায় ‘ন জীবমি’, ‘ণ জাণী’ প্রয়োগগুলি যে সর্বথা অসমীয়া—একথা বলা নাও চলতে পারে। আরো লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, বাংলায় ‘না’ অসমাপিকা ক্রিয়ার আগেই বসে; যেমন—‘না গিয়া কি করিবে’। বিশেষতঃ সম্ভাবনা-সূচক বাক্যে পূর্বকালীন ক্রিয়াংশে ‘না’ সব সময়েই আগে বসে; যেমন—‘যদি সে না যায়, তবে তুমি যাইও’। তবে চর্যায় ন–এর পূর্বনিপাত অবশ্য কবিতার ভাষার দিক থেকেই বিচার্য। তাছাড়া, বিলাক পরসর্গ যোগে বহুবচনের পদ গঠন অসমীয়া ভাষার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলেও চর্যাগীতিতে এর চিহ্নমাত্র পাওয়া যায় না। এমনকি মহাপ্রাণ বর্ণের যে দুর্বল উচ্চারণ—খ-ঘ–এর জায়গায় ক-গ, ছ-ঝ–এর জায়গায় চ-জ অসমীয়া ভাষায় লক্ষ্য করা যায় (যথা—‘জলচর স্থলচর জাকে জাকে পক্ষী’—মাধবকন্দলী, বন্দুলী→বন্ধুলী, ঢকু→চক্ষু), চর্যার ভাষায় এসব একেবারেই নেই। কাজেই দু’-একটি বিষয়ে চর্যাভাষার সঙ্গে অসমীয়া ভাষার মিল থাকলেও সামগ্রিকভাবে এই ভাষা কিন্তু বাংলাভাষার লক্ষণেই লক্ষণান্বিত।
(৩) পরিশেষে চর্যার উপরে মৈথিলী ও হিন্দি ভাষার দাবি যুক্তভাবে বিচার করে এই প্রবন্ধ শেষ করা যাক। যুক্তভাবে বিচার করবার কারণ, গবেষকদের মতে, পূর্বী হিন্দীর সঙ্গে মৈথিলী ভাষার কোন কোন দিক থেকে মিল রয়েছে। বিশেষতঃ সর্বনাম পদগুলির রূপে এবং ক্রিয়াপদের স্ত্রীলিঙ্গীকরণে পূর্বী হিন্দীর সঙ্গে মৈথিলী ভাষার সাদৃশ্য রীতিমত লক্ষ্যণীয়। তাছাড়া –অল, –অব প্রত্যয় দিয়ে যথাক্রমে অতীত ও ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়াপদ গঠনের ক্ষেত্রেও এই উভয় ভাষাতে মিল দেখা যায়। অনুরূপভাবে চর্যার ভাষাতেও ‘জো’, ‘সো’, ‘তো’, ‘মই’ প্রভৃতি সর্বনাম—‘অইছন’, ‘জইসন’, ‘ঐছে’, ‘তৈছে’ প্রভৃতি সর্বনামীয় ক্রিয়া-বিশেষণ—ক্রিয়ার স্ত্রীলিঙ্গীকরণ—‘ভরিতী করুণা-নাবী’ (৮নং চর্যা), ‘রাতি পোহাইলী’ (২৮নং চর্যা) প্রভৃতির প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। অন্যদিকে মৈথিলা ভাষায় ‘কুলস্ত্রী সলজ্জ ভেলী’, ‘কইছনি নায়িকা’ (বর্ণরত্নাকর) ইত্যাদি পাওয়া যায়। এছাড়া মৈথিলীতে নিত্য বর্তমানের প্রথম পুরুষের ক্রিয়ায় যেমন করই, ধরই, সম্ভ্রমে প্রথম পুরুষে অছখি, হোথি রূপগুলি পাওয়া যায়; চর্যাতেও অনুরূপ প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়, যথা—‘ভণই লুই’ (১নং চর্যা), ‘চাটিল গঢ়ই’ (৫নং চর্যা), ‘ভণথি কুক্কুরীপা’ (২০নং চর্যা) ইত্যাদি। কিন্তু তা বলে, চর্যার ভাষাকে যেমন সামগ্রিকভাবে মৈথিলী বলা চলে না, তেমনি একে হিন্দি বলাও সঙ্গত নয়। কারণ, গবেষকদের মতে, –ক, –কো বিভক্তি যোগে ষষ্ঠীর পদ গঠন; এবং –অল, –অব যোগে যথাক্রমে অতীত ও ভবিষ্যতের ক্রিয়াপদ সাধন চর্যার ভাষাতে পাওয়া যায় না। অথচ এগুলি হিন্দি ও মৈথিলী ভাষার বিশিষ্ট লক্ষণ। তবে চর্যার ভাষায় শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাব নিশ্চিতভাবেই রয়েছে। বস্তুতঃ ইতিহাসও একথাই বলে যে, শৌরসেনী অপভ্রংশই হল হিন্দি ভাষার জননী, এবং প্রকারান্তরে ভারতবর্ষের প্রাচ্য অঞ্চলের বিভিন্ন নব্য ভাষাবর্গেরও ধাত্রী। এককালে এই ভাষা সমগ্র উত্তরাপথের সাহিত্যিক ভাষা ছিল। সুতরাং এই সূত্রে প্রাচীনতম বাংলা ভাষায় এর চিহ্ন থাকা সম্পূর্ণভাবেই স্বাভাবিক বিষয়। আসলে ধাত্রীর প্রভাব মাতৃপ্রভাবের মতোই অনপনেয়। আর তাই অপভ্রংশ বা অপভ্রষ্ট প্রভাব শুধু প্রত্ন বাংলা ভাষায় নয়, এমনকি পরবর্তীসময়ের বাংলা ভাষাতেও নিজের অবিচ্ছিন্ন ছাপ রাখতে পেরেছিল।
(ছবি—লুইপাদ)


স্যোসাল মিডিয়া থেকে

Share this content:

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Ken3100
Ken3100
1 month ago
1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x