মণিশংকর বিশ্বাস

মহাবিশ্ব বিশাল, প্রাচীন, এবং অসংখ্য সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহে পরিপূর্ণ।
অসংখ্য বুদ্ধিমান প্রাণের উদ্ভবের এত বিপুল সম্ভাবনা থাকার ফলে, আমাদের তো বহির্জাগতিক প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ দেখতে পাওয়ার কথা! তবুও, বেশ খানিকটা অনুসন্ধানের পরও, মহাবিশ্ব আজও রহস্যজনক ভাবে নীরব। এই বৈপরীত্যকেই বলা হয় ফার্মি প্যারাডক্স, যা প্রথম ১৯৫০ সালে পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি প্রস্তাব করেছিলেন। ফার্মির বিখ্যাত উক্তি, “অন্যরা সবাই কোথায়?” সর্বস্তরের মানুষের, বহির্বিশ্বে উন্নত সভ্যতার উপস্থিতি সম্পর্কে ভাবনাকে উৎসাহিত করেছে, উত্তেজিত করেছে!
তাছাড়া বছরের পর বছর, Star Wars, Star Trek, Marvel Universe, Avatar ইত্যাদি হলিউডি Sci-Fi সিনেমাগুলির প্রভাবে, আমরা প্রায় সকলেই ভাবি যে মহাকাশ অসংখ্য বুদ্ধিমান সভ্যতায় ভরপুর, যাদের বেশিরভাগই আমাদের মতোই দেখতে, এবং তারা একে অপরের সঙ্গে করে প্রতিদন্ধিতা করে গ্যালাক্সিগুলিকে ভাগাভাগি করেছে। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে আমাদের এই অনুসিদ্ধান্তের ভেতরে কতগুলো বিশাল অনুমান লুকিয়ে আছে। আমি এখানে এই অনুমানগুলির উপর এক এক করে আলো ফেলে দেখব, যে ফার্মির প্যারাডক্সখানির যৌক্তিকতা কতটুকু বা আদৌ আছে কিনা।

প্রথম অনুসিদ্ধান্ত: অসংখ্য বসবাসযোগ্য গ্রহ আছে।
আছে কি সত্যিই? মনে হয় এটা খুবই সম্ভাব্য, কারণ শুধু মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই সম্ভবত এক ট্রিলিয়ন গ্রহ রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত নই। হয়তো অনেক গ্রহ আছে যেগুলো প্রায় পৃথিবীর মতো — যেমন শুক্র ও মঙ্গল — কিন্তু একদম সম্পূর্ণ পৃথিবী-সদৃশ গ্রহ খুবই বিরল। উদাহরণস্বরূপ, জীবনের অস্তিত্ব হয়তো নির্ভর করে নির্দিষ্ট পাথর-বরফ বা জলের অনুপাত, একটি বড় চাঁদ, এবং বিশেষ ধরনের প্লেট টেকটোনিক্সের উপর। এই নির্দিষ্টতা আমার কাছে অসম্ভাব্য মনে হয়, কিন্তু সেটাও তো কেবলই আমার অনুমান। তবে সত্যিই আমরা যতক্ষণ না সত্যিকারের পৃথিবী-সদৃশ আরেকটি গ্রহের সন্ধান পাই, ততক্ষণ নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না।

দ্বিতীয় অনুসিদ্ধান্ত: ভিনগ্রহে পৃথিবীর মতো  প্রাণবৈচিত্র রয়েছে।

আছে কি সত্যিই? সত্যি বলতে, আমরা জানিই না। অনেক শক্তিশালী যুক্তি আছে যা বলে যে স্ব-প্রজননশীল জৈবরসায়নের বিকাশ প্রায় অনিবার্য, যদি সঠিক পরিবেশ পাওয়া যায়। কিন্তু সেই পরিবেশ কতটা সাধারণ, তা আমরা জানি না। আর যদি সেই পরিবেশের প্রাচুর্য থাকেও, তবুও হয়তো এমন কোনো বিরল ধাপ আছে যা অতিক্রম করা খুবই অসম্ভব, ফলে সবচেয়ে সহজ মাইক্রোবিয়াল জীবেরও উদ্ভব হয় না।

তৃতীয় অনুসিদ্ধান্ত: ভিনগ্রহে উন্নত বুদ্ধিমান প্রাণ আছে।

আছে কি? এটা সম্পূর্ণ অজানা। আমাদের মনে রাখতে হবে—পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে আজকের পৃথিবী পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস যদি আমরা দেখি,   ৯৯.৯৯৯% সময় এখানে আমাদের পৃথিবীতে কোনো আত্মসচেতন বুদ্ধিমান প্রাণ ছিল না। হয়তো এখানে বুদ্ধিমত্তার উদ্ভব একটা বিরল দুর্ঘটনা, যা অন্য কোথাও পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ইঁদুরের স্তরের বুদ্ধিমত্তা প্রায় ২০ কোটি বছর ধরে ছিল, কিন্তু তার চেয়ে উচ্চস্তরের বুদ্ধি কখনো বড় বিবর্তনগত সুবিধা দেয়নি। (কেন পৃথিবীতে এত দেরিতে বুদ্ধিমান প্রাণ উদ্ভব হলো, এ নিয়ে নানা মত আছে, কিন্তু এগুলো অনেকটাই ‘সাজানো ব্যাখ্যা’—একটা পরিচিত সত্যের উপরে নিজের সুবিধা মতো রঙ চড়ানোর মতোই।

চতুর্থ অনুসিদ্ধান্ত: ভিনগ্রহী বুদ্ধিমান প্রজাতি আন্তঃছায়াপথ বা আন্তঃনাক্ষত্রিক ‘উপনিবেশ’ গড়তে চায়।
এখন কথা হল, এমন কোনো প্রজাতি থাকলেও তারা কি সত্যিই এমনটা চায়? জীবনের স্বভাবই হলো পরিবেশের প্রতিটি কোণ দখল করা, আর মানুষ তো ছড়িয়ে পড়তে ভালোবাসে, ভালোবাসে কলোনি গড়তে। আমাদের পৃথিবীর অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় এটাই জীবনের সাধারণ প্রবণতা, কিন্তু আমরা এখানেও অনেক বড় একটা অনুমান করছি। হয়তো অন্য বুদ্ধিমান প্রাণের লক্ষ্য একেবারেই ভিন্ন—হয়তো তাদের আগ্রহ এরকম উপনিবেশ গড়াতে নয়, বরং অন্য কিছু।

পঞ্চম অনুসিদ্ধান্ত:  বুদ্ধিমান প্রজাতি মানেই প্রযুক্তিনির্ভর প্রজাতিতে পরিণত হয়। সবাই কি হয়? মানুষের ক্ষেত্রে হয়েছে, কিন্তু ডলফিনদের বুদ্ধিমত্তা থাকা সত্ত্বেও তারা কখনো প্রযুক্তির দিকে ঝোঁকেনি। কাক, শিম্পাঞ্জি, বোনোবোরাও সহজ সরঞ্জাম ব্যবহার করে, কিন্তু তারা কোনো বিবর্তনগত চাপে প্রযুক্তিনির্ভর জীব হয়ে ওঠেনি। সত্যিই কোথাও জটিল প্রাণের আবির্ভাব ঘটলে, হতে পারে তাঁরা প্রযুক্তিনির্ভরতার দিকে ঝোঁকেনি বা কোনোদিনই মহাকাশযান আবিষ্কার করবে না। বরং ডায়ানোসর, এমনকি নিয়ানডারথাল ইত্যাদির মতো করেই মিলিয়ন বছর কাটিয়ে দেবে এবং তারপর অন্য কোনো প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়ে যাবে, কিন্তু তারাও প্রযুক্তিনির্ভর নয়— ডায়ানোসর থেকে পাখিদের মতো হয়ে থেকে যাবে আরও বহুকাল!

ষষ্ঠ অনুসিদ্ধান্ত: প্রযুক্তিনির্ভর প্রজাতি আলোর গতিবেগের উল্লেখযোগ্য ভগ্নাংশে মহাকাশ-ভ্রমণ করতে পারে। উল্লেখযোগ্য বলতে আলোর গতির অন্তত ২% এর বেশি। সত্যিই কী এমন প্রযুক্তি অনায়াস-সাধ্য? মানব প্রযুক্তির দিক থেকে বিচার করলে, এটা ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হতেও পারে। কিন্তু বাস্তবে, আমাদের তৈরি দ্রুততম মহাকাশযানটির পরের নক্ষত্রে পৌঁছাতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার বছর লেগে যাবে। এরকম গতিতে  এক গ্যালাক্সি থেকে অন্য গ্যালাক্সিতে পৌঁছানো তো অনেক দূরের বিষয়, এক স্টার সিস্টেম থেকে অন্য স্টার সিস্টেমেও উপনিবেশ গড়া সম্ভব না। তাই আমাদের ধরে নিতে হয়—উন্নত সভ্যতার কাছে এমন প্রযুক্তি আছে যা এখনও আমাদের কাছে প্রমাণিত নয়, কিন্তু তাদের জন্য তা সম্ভব ও কার্যকর। কিন্তু সবচেয়ে সম্ভাব্য মনে হয়, হয়তো বুদ্ধিমান প্রাণীরা আছে, কিন্তু তাঁরা একে অপর থেকে অনেক দূরের বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে। তাঁরাও আমাদের মতোই অনুমান নির্ভর কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই আটকে আছে।

সপ্তম অনুসিদ্ধান্ত:  বুদ্ধিমান, প্রযুক্তিনির্ভর, মহাকাশ-অনুসন্ধিৎসু প্রজাতিগুলো দীর্ঘকাল টিকে থাকে। কিন্তু সত্যিই কী তারা টিকে থাকে? এটা আমরা একদমই জানি না। পৃথিবীর বয়স ৪.৫ বিলিয়ন বছর। আর এখানে জীবন প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর ধরে আছে। স্থলজ প্রাণ প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর ধরে। ইঁদুর স্তরের বুদ্ধিমত্তা প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর ধরে আছে। মনুষ্যজাতি মাত্র ১ লক্ষ বছর পুরনো। আমরা মহাকাশে যেতে পেরেছি মাত্র ১০০ বছরও হয়নি। অথচ আমাদের বিলুপ্তি কী অবশ্যম্ভাবী!— কিন্তু যদি আমরা আরও ১ লক্ষ বছরও টিকে থাকি, তবুও সেটা গ্যালাক্সি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার জন্য সেটা যথেষ্ট সময় নয়, এমনকি প্রযুক্তি ও ইচ্ছা থাকলেও না। যদি সাধারণত বুদ্ধিমান প্রজাতির আয়ু ১ লক্ষ বছরেরও কম হয়, তবে হয়তো অনেক সভ্যতা এসেছে ও চলে গেছে—আমরা তাদের অস্তিত্ব জানবার আগেই। বা আমাদের অস্তিত্ব তাঁরা জানবার আগেই। ভবিষ্যতেও এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। অর্থাৎ সুদূরে দুটি ভিন্ন ভিন্ন স্টার সিস্টেমে দুটি অতি উন্নত সভ্যতা যা চমকপ্রদ গতিতে একে অপরের সংকেত বার্তা পড়তে পারে এবং বার্তা পাঠাতেও পারে, এরকমটা হবার সম্ভাবনা কতখানি? শুধু আমি নয়, অনেক বিজ্ঞানীও মনে করেন, এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই হতে পারে কোনো একদিন আমরা ভিনগ্রহের কোনো সভ্যতার রেডিও বার্তা পাবো, কিন্তু বার্তাটি আমাদের কাছে পৌঁছাতে যত সময় লাগবে, ততদিনে তারা হয়তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর আমরা যদি সেই রেডিও বার্তার উত্তর পাঠাই, সেটি সেখানে পৌঁছানোর সময় হয়তো আমরা নিজেরাই আর থাকবো না।

তাহলে একটিমাত্র উত্তর নয়—বরং বহু সম্ভাব্য কারণ মিলেই হয়তো আমরা বুঝতে পারব, কেন আমরা কোনো ভিনগ্রহী সভ্যতার প্রমাণ দেখি না! আর এই বিশ্লেষণেও আরও অদ্ভুত সম্ভাবনাগুলো তো ধরাই হয়নি—যেমন তারা হয়তো আছে, কিন্তু আমাদের পক্ষে অদৃশ্য, বা ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজেদের আড়াল করে রেখেছে।
তাছাড়া, তারা কেনই বা সময় ও শক্তি নষ্ট করবে এখানে আসতে? শেষ কবে আমরা শুধু “যেতে ইচ্ছে হলো” বলে খুব দূরে কোথাও গিয়েছি? আর মানবিক দূরত্বগুলি তো তুলনায় অতি ক্ষুদ্র দূরত্ব! কিন্তু ভিনগ্রহী প্রাণ যদি সত্যিই আমাদের সম্পর্কে জানে, তবে হয়তো দেখেছে আমরা নিজেদের গ্রহ ধ্বংস করছি, পারমাণবিক যুদ্ধ করছি, জেনোসাইড ঘটাচ্ছি, তুচ্ছ বা কোনো কারণ ছাড়াই। আমরা যদি আমাদেরই মত কুচুটে লোকজনে ভর্তি অন্য একটি গ্রহের খোঁজ পাই, আমরাই আমাদের বাচ্চাদের হয়ত বলে বসব, “যদি ভালো না হও, তোমাকে ওই গ্রহে রেখে আসব!”

তাই হতে পারে আমাদের মহাজাগতিক ‘প্রতিবেশীরা’ আমাদের মতো গোলমালপ্রিয়, নোংরা, উদ্ধত ও হিংস্র প্রাণীদের দেখে আতঙ্কিত। তাই তারা সভ্য ও ভদ্র লোকের মতো জানালার পর্দা টেনে রেখেছে, দরজা বন্ধ করেছে—আশা করছে আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করে ফেলব, গ্যালাক্সির অন্য অংশে তাদেরকে আবিষ্কার করবার আগেই।
এটুকু লিখেই শেষ করব ভেবেছিলাম। কিন্তু তাহলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কথা বাকি থেকে যায়।

আমরা ভাবি যে মহাবিশ্ব অনেক পুরনো, কিন্তু আসলে কিন্তু তা নয়। নক্ষত্রযুগ—যে সময়কালে নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ ইত্যাদির অস্তিত্ব সম্ভব—তার আনুমানিক স্থায়িত্ব প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন বছর। এদিকে আমাদের মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩.৭৫ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ, এটি মোট আয়ুষ্কালের প্রায় সাত হাজার দুশো সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র—অর্থাৎ মহাবিশ্ব অবিশ্বাস্যরকম তরুণ। মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মানুষের গড় আয়ু যদি ৭৫ বছর ধরি, তাহলে মহাবিশ্বের বয়স ৪ দিনেরও কম।

অধিকাংশ নক্ষত্র, পর্যায় সারণির লোহা পর্যন্ত মৌলিক পদার্থগুলি তৈরি করতে পারে। যখন লোহা তৈরি হয়, তখন নক্ষত্রগুলিতে আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না যা লোহার চেয়েও ভারী মৌলিকগুলি তৈরি করতে পারে। যখন কোনো বৃহৎ নক্ষত্র সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হয়, তখন প্রচণ্ড তাপ ও নিউট্রনের প্রবাহের ফলে দ্রুত নিউট্রন শোষণ প্রক্রিয়া (r-process) ঘটে—পরমাণুর নিউক্লিয়াস দ্রুত নিউট্রন গ্রহণ করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিটা ক্ষয় (beta decay) ঘটে, যার ফলে সোনা, ইউরেনিয়াম ও প্লাটিনামের মতো ভারী মৌলিকগুলি তৈরি হয়।
একইভাবে, যখন দুটি নিউট্রন নক্ষত্র পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখনও তারা  অনেক পরিমাণে ভারী মৌল সৃষ্টি হয়।
সংক্ষেপে বলা যায়: সুপারনোভা বিস্ফোরণ এবং নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে দ্রুত নিউট্রন শোষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লোহার চেয়ে ভারী উপাদানগুলো তৈরি হয় এবং মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে—এগুলিই পরে আবার নতুন নক্ষত্রের অংশ হয়ে যায়।

একটি নক্ষত্রে এই ভারী ধাতব উপাদানের পরিমাণকে বলে তার ‘ধাতবতা’ বা Metallicity। আমাদের মতো জটিল জীবনের বিকাশের জন্য প্রচুর পরিমাণে এই ভারী মৌলগুলি দরকার।

তাহলে, মহাবিশ্ব প্রথমে গঠিত হয়, তারপর অনেক সময় ধরে যথেষ্ট ধাতবতা আছে এরকম একটি নক্ষত্রের আবির্ভাব হয়। সূর্য এরকম একটি নক্ষত্র। যথেষ্ট ধাতবতা আছে এইরকম সব নক্ষত্র গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কাছে দ্রুত সৃষ্টি হয়, কিন্তু সেখানে পরিবেশ খুবই ‘বিপজ্জনক’—অত্যধিক বিকিরণ, বিস্ফোরণ, ব্ল্যাকহোল ইত্যাদির কারণে জীবন ওই অঞ্চলে টিকতে পারে না। তাই গ্যালাক্সি কেন্দ্রের খুব কাছে জীবকোষ টিকে থাকতে পারে না। পালসার বা সুপারনোভার মারণ বিকিরণে পুড়ে যাবে অবধারিত ভাবেই। আবার খুব বাইরে গেলে ধাতবতা এত কম থাকে যে জটিল জীবন গঠনই সম্ভব নয়। ফলে, প্রতিটি গ্যালাক্সিতে এমন একটি বলয় থাকে—যেখানে জীবন বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ থাকে। অনুরূপভাবে, প্রতিটি সৌরজগতের মধ্যেও একটি বাসযোগ্য অঞ্চল থাকে যেখানে তাপমাত্রা তরল জলের উপযোগী, যাকে গোল্ডিলকস জোন বলা হয়।

এখন ধরা যাক, কোনো গ্রহ রয়েছে যা তার সৌরজগতের বাসযোগ্য অঞ্চলে অবস্থিত, এবং সেই নক্ষত্রও গ্যালাক্টিক গোল্ডিলকস জোন বা বাসযোগ্য অঞ্চলে আছে। তাহলে সেখানে জীবনের সম্ভাবনা তৈরি হয় অবশ্যই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর মতো সুজলা সুফলা জায়গাতেও, অধিকাংশ জীবনই আসলে এককোষী জীব। সেই এককোষী জীব থেকে মানুষের মতো এমন বুদ্ধিমান প্রাণীতে পরিণত হতে—যে সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারে, বা সহজভাবে বললে, ঠিকভাবে পাথরের অস্ত্র বানাতে পারে— কমপক্ষে লাগে দু’ বিলিয়ন বছর। সব মিলিয়ে, এই গোটা প্রক্রিয়ায় প্রাণের প্রযুক্তিগত সভ্যতা হয়ে উঠতে অবিশ্বাস্য দীর্ঘ সময় লাগে। এবং এই কথাটাই এতক্ষণ ধরে বলতে চাইছি!
কাউকে না কাউকে তো প্রথম হতেই হবে। আমরা কিভাবে জানলাম যে আমরা নিজেরাই সেই ‘আদিতম’ উন্নত প্রাণ নই? হয়তো আমরা এখনও কোনো ভিনগ্রহী সভ্যতা দেখতে পাইনি কারণ এই মুহূর্ত পর্যন্ত আমরাই একমাত্র যারা এতদূর পৌঁছেছি!

IMG-20251121-WA0000 ফার্মি প্যারাডক্স: সবাই তাহলে কোথায়?

Share this content:

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x