আজ পুরুলিয়া’র জন্মদিন। একবারই গেছি আর দেখেছি যেভাবে তাকে।
★★★★

বরাভূমের ডাইরি

                 ✍️ হেমন্ত সরখেল। 


   'যখন থামে না সময়'

অরুণের পদরেণু উজোৎ করে ওঠেনি তখনও | বিধুর কোদালে পাথরের টুকরো চরিত্র হারাবে বলে থিরথির কাঁপছে | কাঁখ নেই বলে যে সমতলী রমনী বুকে আছাড়ি পিছাড়ি তোলে, এ টাঁঢ় যদি একবার দেখে ফেলতো তাকে, ঘিরে ফেলতো বর্তনীর কালিখে | কলস নির্ভয়ে দাঁড়াবে স্থির, এ কথা বরাভূমের রাস্তা নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারেনি আজতক |
গোঠে ফিরতে দেখেছিলাম যাদের গত শামে আজ তারা ছায়াহীন বন্ধনহীন চৈতন্যের সীমারেখা ছুঁইয়ে দেবে বলে ঝলক ঝলক হাসি ছিটিয়ে আমাদের ঠায় দাঁড় করিয়ে পাশ কেটে যায় | এখন কাজের কাল বটে…
জানি, পাথর গুঁড়ো হয়ে চূর্ণিত মাটি অপেক্ষায় আছে ঝরনাকোচার বিচূর্ণ বিন্দুর ভঙ্গিল গতিপথে | আরও বড়ো অপেক্ষায় আছে বরাভূম উন্মত্ত বরিষণের | যে পথ জুতোর সোল ফাটিয়ে দেয় হেলে পড়া দেহভারে তার গায়ে জন্মদাগ হয়ে জমে আছে অখিলের আদিম কঠোরতা | উদোম শরীরে প্রাত্যহিক পুড়ে যায় নিজেকে ফাটিয়ে গলিয়ে ভাসিয়ে নিতে চেয়ে | আর তলদেশে, সেই নিচে, হাঁ করে আছে যেখানে চিরন্তনী তৃষা, আমাদেরও পরোশী ভেবে হয়তো বা কিছু বলে যেতে চায় | ওগো তাপহারিনী, তোমায় বুঝতে পারি কোথায়…
এরূপ দৃশ্যমানতা যে দেদার চকিত করবে তা আমরা যারা পাহাড়ে পূর্বে পা ফেলেছি, তারা বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। যেটা জানা নেই তা হলো, এর ঢালু খটখটে পথে প্রাক্ বসন্তের ছোঁয়াচে হাওয়ায় ঝুরোঝুরো খসা পত্রসম্ভার হয়তো বা বুকে-পিঠে লুকিয়ে রেখেছে বিষধর, হয়তো বা সুউচ্চ গড়ান যার দেহ করেছে নিটোল, সে নুড়িপাথরের দল তোমায় ঝুঁকিয়ে দেবে সামনে, আনন্দে-খুশিতে যদি ভ্রম জন্মে যায় মনে, যদি ভুলে যাও- এই যাকে পদতলে মারিয়ে এগোচ্ছ শনৈ শনৈ- সে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে, নিমেষে মনে পড়ে যাবে- এ ই তোমার শেষ আশ্রয়, এ ই তুমি হবে, হতে চাও, হবে বলেই এত হুটোপুটি, আজন্মকাল তৃষিত ভ্রাম্যমানতা তোমায় টেনে নিয়ে চলে পর্বতগাত্র থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠে, খেটে খাওয়া মানবচারণ আর বেদুইন গোত্রে। এই ‘টু বী’ – আপন মাধুরি নিয়ে ছলছল বিলাসী টাঁঢ়-এ চলতি পথে দাঁড় করিয়ে দেয় এক দমকে।
ধধকে শেষ হয় পথ নিম্ন জলাভূমির বুকে। পক্ক গালিচা ঘাসের। পথক্লান্তের জিরোন স্তম্ভ শাব্দিক মনুষ্যকুলের। এসো আরোহী- এসো এই ঝরনাকোচার পৃষ্ঠে গলিত পার্বত্য কান্না যেখানে জমে জমে তৈরি করে জলাধার, যেখানে পশুরা জল খেতে আসে, নিজেদের দেখতে আসে প্রকৃতির আয়নায়।
আত্মহারা হয়ে রইলাম! বয়স হারিয়ে সূর্যের ছাঁট টেনে নিলাম চোখে-মুখে। এখন, এই পাহাড় প্যাঁচানো শুষ্ক জলাভূমি হয়ে উঠছে বরাভূম- সাজছে অনাবিষ্কৃত ‘টু-বী’, আত্মমগ্ন কতক আনাড়ি অভিযাত্রী’র বাউলিয়া উল্লাসে। সামনে ওটা কী ? প্রশ্ন সামুহিক চোখে…
অদ্ভুত এ ধরিত্রী! কণ্টকাকীর্ণ ঠা ঠা টাঁঢ়ের বুকে সবুজাভা যেখানে বিরল, হোথা বিল্ববৃক্ষ কোলে ফল সাজিয়ে রেখেছে! কার জন্য! কে আসবে এই ঝরনাকোচার গনগনে উত্তাপ সয়ে ফলগ্রহণে তোমায় ধন্য করতে ? আসে তো বকরিপালক, শুকনো কাঁটা আর শালপাতা কুড়ানি রমনা! তাদের সময় কোথায় তোমার দিকে ফিরেও তাকাবার! আর আসে আমাদের মতো পর্বতগাত্রে জলছবি আঁকার মতলবে কিয়দ্দুচ্চার পঙ্গপাল, ধ্যানগম্ভীর প্রাজ্ঞ শৈলের মৌনতা হয়ে ওঠে খানখান্। হয়তো বা বিরক্ত হলে, হে বরাভূম, যুগে যুগেই তো এই হয়ে এসেছে। নিজের সীমাবদ্ধ মনন,চেতন দিয়ে বিরাটকে বোঝার নিষ্ফল প্রচেষ্টা এবং তৎপশ্চাদ্ ক্ষুদ্রত্বের এহসাসে গুম হয়ে বসে থাকা।
যে ছেলেটা একটা ছোট্ট বাহনে দশজনকে ঠুঁসে নিয়ে পাড়ি দেয় আঠাশ কিলোমিটার পথ, যাত্রাপূর্বে সামান্য দর-দাম নিয়ে যার মাথা ব্যথা, এখানে, এই পাহাড়ে, তার বালখিল্য আচরণে রমে ওঠে পরিবেশ। ভুলে যাই- সে অন্য কেউ। তার চকচকে চোখ, হঠাৎই গুরুজনসুলভ গাইডেন্স সকলের মুখে মুখে ফেরায় তাকে- আরে! ধনঞ্জয় কোথায়? তখন সে রীতিমতো আশঙ্কিত পাংশু ঝর্ণার মগডালে উঠে পড়া অত্যুৎসাহী আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে। পার্বত্য ক্ষীণ পথ বেয়ে উঠে আসেন স্থানীয় কাঠুরিয়া, কাঁধে কুঠার সাথে বকরির পাল। তাদের যূথবদ্ধতা বলে দেয় কী পাক্কোশ দক্ষতা অর্জিত হয় অভ্যাসে!
যাত্রী, পথ খুঁজে ফেরে নিয়ত। কুলাচ ডানায় ভরে দেয় ওজ। মন বিহঙ্গ হলে ভেদ অভেদ সব ধুয়ে মুছে একাকার। আসলে, হয়তো বা সময় যা যেভাবে সাজিয়ে রাখবে বলে অঙ্গীকারবদ্ধ কালের কাছে, তারই মূল্য চুকাতে হয় আমাদের, বিনয়ী হতে হয়, নতজানু হতে হয় এই বিরাটের নান্দনিকতার সামনে। সামান্য কিছু কলি বলে যায়-
‘– জপকোটিগুণং ধ্যানং ধ্যানকোটি গুণো লয়ঃ।
লয়কোটি গুণং গানং গানাৎ পরতরং ন হি।।’
— গান, গান, এখন গান ছাড়া যে মান থাকে না!
এবার একটু কাত হয়ে এগোন। সংকীর্ণ পাকদণ্ডী নিম্নগামী। শেষ হলো ক্ষুরধার উপলখণ্ডের কোলে। বারিধারা ত্বক করেছে মসৃণ। সামনে ঝুঁকে দেখা গেল, এটাই সেই ঝর্ণা, দুরন্তপনা ছড়িয়ে বরিষসময়ে হ্রদ ভরিয়ে রাখে। পাশের পথ ধরে নেমে আসুন তার কোলে। না, ইন্দিবর নয়, এগুলি শাপলা। রক্তলোচনে ডাকছে কাছে। ব্যাপক আমন্ত্রণ। আবহবিকারে একা হয়ে যাওয়া উঁচু এক পাথরের ওপরে উঠে পড়ুন একবার। প্রসারিত করে দিন হস্ত। পূর্ণ হোক আকাশকে ছুঁয়ে ফেলতে চাওয়া। চোখ জমে গেলে মোবাইল ক্যামেরার লেন্সে আপনি আর তখন পর্যটক নন, একাত্ম কোন এক জন।
সামনে জলাশয়। পায়ের কাছে অসংখ্য নুড়ি। লোভ সামলানো গেল না। একটু চ্যাপ্টা টুকরো খুঁজে ব্যাঙ-চাড়া খেলা শুরু করতেই তরুণ হিমাংশু আর আমি টপাটপ বয়সের উৎরাই ভাঙছি। আরেকপ্রস্থ ফটো ক্লিকিয়ে নেওয়া গেল। রোদ চড়ছে, এবার ফেরার পালা।
এই সেই মাটি। যেখানের কঠিন দৈনন্দিনী সারল্যের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছে দারিদ্র্য ও শ্রম। যেখানে অধিকারের চিল চিৎকার চলে না, চললেও, কেউ শোনে না। এখানে বধির শাসন। অন্যায়ের প্রতিবাদ ঘোষিত হলে তুমি দেগে নেবে নিজেকে অ্যাওবাদী, ট্যাঁওবাদী রূপে। কুঠুরি আস্তানা, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে অন দ্য স্পট পঞ্চত্বপ্রাপ্তিও জুটে যেতে পারে। শাসন এভাবেই নিজের ব্যর্থতা মুছে দেয়, লেপে দেয় ল্যাটেরাইট মৃত্তিকাগৃহের ভেতরের-বাইরের দেওয়ালে সাধারণী দুঃসহ ভার। তার আগে মথে নেয়, বেছে নেয় রোধের-বিরোধের নুড়ি-পাথর। শুকিয়ে গেলে, রঙে সাজিয়ে বলে- কই! কোথায় প্রবঞ্চনা! দেখে যান- কোথায় দেখতে পান অত্যাচার!
নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় বরাহভূম ভাবনাটা আসছিল। ফোন করলাম আকাঙ্খাদি’কে। শুনলাম- ‘দুটো ভূম। একটা বরা, অপরটি মান। বেশ, আমরা তা ই জানলাম।
ধনঞ্জয় রাতে স্টলে এল। আমরা খেয়েছি কিনা, আর কোন অসুবিধে আছে কিনা খোঁজ নিলো। ফিরতি পথে বাসেও খোঁজ নিল। ওর সংযোগের দশটি সংখ্যা অতি যত্নে রেখেছি। অতি যত্নে। মানুষের যেমন রাখা হয় আরকি !
আবার আসিব ফিরে, ওগো লালমাটিয়া, তোমার নীড়ে…
★★★

Share this content:

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x