বিট্টু বসাক
সৌরভ আর মীরা ছোটবেলার বন্ধু। এক পাড়ায় বড় হওয়া, একই স্কুলে পড়া। সৌরভ সবসময় মীরাকে আগলে রাখত। মীরা যখন একটা দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিল, সৌরভ নিজের কলেজের সেমিস্টার ফেলে রেখে হাসপাতালে দিনরাত বসে থেকেছিল। চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের মোটরবাইক পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিল। মীরা সুস্থ হয়ে বলেছিল, “তুই না থাকলে আমি বাঁচতাম না। সারাজীবন ঋণী থাকব তোর কাছে।”
বছর কেটে গেছে। মীরা এখন বড় কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। ব্যস্ত জীবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি—সব আছে তার। সৌরভ একটা সাধারণ চাকরি করে, দিন শেষে ক্লান্ত শরীর আর মাথার ওপরে অনিশ্চয়তার বোঝা।
একদিন সৌরভের বাবার হার্ট অ্যাটাক হল। জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য মোটা অঙ্কের টাকার দরকার। সৌরভ ছুটে গেল মীরার কাছে।
“মীরা, আমি খুব বিপদে পড়েছি। তোর সাহায্য দরকার।”
মীরা তখন বড় কাঁচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ব্যস্তভাবে ফোনে কথা বলছিল। সৌরভর কথা শুনে একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “এখন একটু ব্যস্ত আছি দ্বারা, ফোন রেখে দেওয়ার পর বলল, বল কী সমস্যা?”
সৌরভ সব খুলে বলল। মীরা চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, তুই কি আমার কাছে “টাকা চাচ্ছিস?”
সৌরভ মাথা নিচু করে বলল “হ্যাঁ।”
মীরা হালকা হাসল। “আমার কাছে অত টাকা নেই, আর তোর বাবার বয়স তো অনেক হয়ে গেছে। চিকিৎসা করালেও কি উনি বাঁচবেন? বাস্তবতা বুঝতে শেখ, সৌরভ।”
কোথা থেকে যে আপদটা এলো আমার কাছে এখন সুইজারল্যান্ডের ট্রিপটাই না ক্যান্সেল হয়ে যায়, এক্ষুনি বেরোতে হবে ফ্লাইটের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে (মনে মনে এটায় ভাবছিল মীরা)।
সৌরভ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকল। “তুই কী কথাটা সিরিয়াসলি বলছিস মীরা ?”
মীরা ঠান্ডা গলায় বলল, “অবশ্যই। আমি এখন মিটিংয়ে যাব। তুই তো বড় হয়েছিস, চাকরীও করিস নিজে একটু ম্যানেজ করে নে আমার কাছে এখন অতো টাকা নেই।”
সৌরভ উঠে দাঁড়াল। দরজা পর্যন্ত গিয়ে থেমে বলল, “যেদিন তুই হাসপাতালের বেডে শুয়ে ছিলি, সেদিন আমি বাস্তবতা বুঝিনি। বোধহয় ভুল করেছিলাম।”
মীরা চোখ নামিয়ে ফোনে মেসেজ টাইপ করতে লাগল। সৌরভ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
রাস্তার ধারে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকল। কিছুক্ষণ পর ফোনটা বেজে উঠল—হাসপাতাল থেকে। ওপাশ থেকে গলাটা বলল, “উনি আর নেই।” বুকটা হু হু করে ওঠে সৌরভের। তার বাবা আর নেই।
তার মনে পড়ল সেই দিনটার কথা, যেদিন মীরা মৃত্যুর মুখে পড়ে ছিল। নিজের সব হারিয়েও সে মীরাকে বাঁচিয়েছিল। আর আজ?
পাশের রাস্তায় মীরার গাড়িটা দ্রুত গতিতে চলে গেল। সৌরভ একবারও ফিরে তাকাল না। তার চোখ থেকে ধীরে ধীরে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সে বুঝল—সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক বদলায়, আর মীরার মতো মানুষ অতীত কে দ্রুত ভুলে যায়।

Share this content:

Asadharon