গোল
বিট্টু বসাক

অজ পাড়াগাঁয়ে একটুকরো চাঁদ বিপ্লব আর শুরভি।
শুরভি গ্রামের ছোট্ট এক পরিবারে জন্মানো, কিন্তু তার স্বপ্ন বিশাল। পড়াশোনায় বরাবরই সেরা, তার রেজাল্ট শুধু তার পরিবার নয়, পুরো গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছে। মিষ্টি হাসি আর সৌজন্যতায় সে সবার প্রিয়। দেখতে সুন্দর, কিন্তু তার সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় তার বুদ্ধিমত্তা। চোখে থাকে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক, আর কথায় পরিণত বুদ্ধির পরিচয়। পরীক্ষার ফলাফল আসার দিন গ্রামবাসী তার নাম শুনে গর্বিত হয়। গ্রামের স্কুলে পড়েও সে বড় বড় শহরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে শীর্ষে জায়গা করে নেয়। সবাই বলে, “ওই মেয়েটি আমাদের গ্রামের গর্ব।” তার স্বপ্ন বড় হয়ে আরও সফল হওয়া, যাতে গ্রামকে দেশজুড়ে পরিচিত করতে পারে।

আর বিপ্লব ধূর তার কথা খেলার মাঠ আর গুটিকয়েক লোকজন ছাড়া আর কী কেউ জানে তা ঠিক জানা নেই। বাউন্ডুলে ফাঁকিবাজ এক ছেলে ফুটবল আর মাঠ ছাড়া কিচ্ছু বোঝেনা। খেলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পজিশনে।
মাঠে সে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন প্রতিপক্ষের আক্রমণের দেয়াল। পায়ের নিচে বল মানেই নিখুঁত পাস বা প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভাঙা অথবা নিখুঁত সেটপিস বা দুর্দান্ত এসিস্ট সবতেই সেরা সে। প্রতিদিন মাঠে পড়ে থেকে নিজেকে গড়ে তুলেছে। পড়াশোনার কথা ভুলে সে শুধুই খেলার প্রতি নিবেদিত। শক্ত ট্যাকল আর দূরদর্শী পাসে সে দলের মেরুদণ্ড। দল হারুক বা জিতুক, সে নিজের জায়গা থেকে একচুল নড়ে না। ম্যাচের শেষে কাদায় মাখামাখি হয়ে গেলেও মুখে থাকে যুদ্ধজয়ের গর্ব। কোচের কাছে সে বিশ্বস্ত, আর দলের জন্য নির্ভরযোগ্য। ফুটবল তার কাছে খেলা নয়, বেঁচে থাকার মতো কিছু।

এমন দুজনের কিভাবে যেন ভাব ভালোবাসা হয় বাপু তা বোঝা বড্ড দায়।

ব্লকের সমস্ত স্কুল নিয়ে আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা চলছিল তাদেরই স্কুলের মাঠে। ফুটবল মাঠে ছেলেটির দৃঢ়তা দেখে মন ছুঁয়ে যায় শুরভির। কীভাবে একা দলকে সামলাচ্ছে। হঠাৎ ভিরের মাঝে শুরভিকে দেখতে পায় বিপ্লব মেয়েটির মিষ্টি হাসি ওকে যেন অন্য রকম এক প্রশান্তি দিল। খেলাশেষে বাড়ি ফেরার সময় শুরভি পেছন থেকে বলল, “তুমি তো দুর্দান্ত খেলো!” বিপ্লব হেসে উত্তর দিল, “তোমার প্রশংসা শুনে আমার ভালো লাগলো। এখান থেকেই শুরু হলো একে অপরকে জানার ছোট্ট শুরু। স্কুলেও ওদের দেখা হত মাঝে মাঝে। স্কুল শেষে অনুশীলনের সময় মাঠের পাশে ছোট ছোট কথায় ওদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। শুরভি তাকে জীবনের মূল্য বোঝায়, আর বিপ্লব ওকে সাহস জোগায়। ধীরে ধীরে সেটা আরও গাঢ় হতে থাকে। তাদের প্রেম ছিল নিঃশব্দ, তবু গভীর।
এরপর শুরভি পড়াশোনার জন্য বিপ্লবকে ধীরে ধীরে এড়িয়ে চলে। পড়াশোনার সুত্রে বাইরে থাকে সে। পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি পায় শুরভি। এর সাথে সাথেই বিয়ে ঠিক হয় তার সহকর্মী শৌনকের সাথে, আজ শুরভির সাথে শৌনকের বিয়ে।

এদিকে, বিপ্লব ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকায়, তার পুরো মনোযোগ ছিল খেলার দিকে। শুরভির বিয়ের খবর যখন বিপ্লবেরর কাছে পৌঁছায়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওর মনে হলো, প্রতিবার সকল কে কাটিয়ে অন্যদের ডজ করে এসে পেনাল্টি বক্সের কাছাকাছি এসে স্ট্রাইকারকে পাস দেয়, স্ট্রাইকার যখন গোলটা করে, সবাই তখন গোলদাতাকে ঘিরে আনন্দ করে! স্কোরবোর্ডে নাম হয় সেই গোলদাতার, কিন্তু সে থেকে যায় আড়ালে, অদৃশ্য। তার মনে হতে থাকে, জীবনেও সে শুরভির পাশে ছিল ডিফেন্ডারের মতো, সবসময় তার জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, তাকে আগলে রাখতে, যেকোনো প্র‍য়োজনে বিপ্লবই ছিল সব। অথচ শুরভির জীবনের গোল পূরণের জন্য যখনি পাশ বাড়িয়েছে গোলটা করেছে অন্য কেউ। শুরভির বিয়ে আজ! বিয়ে করবে অন্য একজনকে, বিপ্লব অনুভব করে, সে যেন সারাজীবন ফুটবলের মতো নিজের দায়িত্ব পালন করেছিল, কিন্তু গোলটা সে পায়নি।

বিয়ের সন্ধ্যায়, ফুটবল মাঠে বসে বিপ্লব মনে মনে শুরভিকে শুভেচ্ছা জানায়। সে জানে, শুরভির জীবনে তার স্থান শুধু একজন মাটির সৈনিকের মতো।
অন্ধকার নেমে আসে মাঠে। বিপ্লব উঠে দাঁড়ায়, বলটা হাতে নিয়ে নতুন দিনের জন্য প্রস্তুত হয়। হয়তো জীবনের পরবর্তী ম্যাচে, কোনো একদিন, সে নিজেই গোল করবে।

7536-1024x768 গোল

Share this content:

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x