– রানা চক্রবর্তী
চৈতন্যসম্প্রদায়ের মধ্যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পরেই নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর স্থান। গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উপরে তাঁর মহিমা ও প্রভাব অলোকসামান্য। কিন্তু এহেন নিত্যানন্দের জীবন সম্পর্কে অধিকাংশ তথ্যই এখনও ঐতিহাসিকদের কাছে অজানা থেকে গিয়েছে। তাঁর প্রথম জীবন সম্বন্ধে তাঁর শিষ্য বৃন্দাবন দাস রচিত ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থের আদিখণ্ডের ষষ্ঠ অধ্যায়ে এবং মধ্যখণ্ডের তৃতীয় অধ্যায়ে সংক্ষিপ্ত হলেও সুস্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়। কিন্তু নিত্যানন্দ সম্পর্কে যে প্রশ্নগুলি আজও ঐতিহাসিকদের কাছে স্পষ্ট হয়নি, সেগুলি নিম্নরূপ —(১) চৈতন্যদেব সন্ন্যাসগ্রহণ করবার পরে নিত্যানন্দ তাঁর সঙ্গেই নীলাচলে গিয়েছিলেন। কিন্তু এর কয়েকবছর বাদেই তিনি আবার বাংলায় ফিরে এসেছিলেন কেন? এই প্রসঙ্গে অতীতের চৈতন্যচরিতগ্রন্থগুলিতে বলা হয়েছিল যে, শ্রীচৈতন্যদেবই তাঁকে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম প্রচার করবার জন্য বাংলায় ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু— তাঁর সেই প্রত্যাবর্তন এতটাই আকস্মিক ছিল যে, গবেষকরা আজও চৈতন্যচরিতগ্রন্থগুলির কথায় সম্পূর্ণভাবে আস্থা স্থাপন করতে পারেননি।(২) জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ গ্রন্থটি থেকে প্রামাণিকভাবে জানা যায় যে, নিত্যানন্দ দু’বার বিবাহ করেছিলেন —“সূর্য্যদাস-নন্দিনী শ্রীবসু জাহ্নবী।পাণিগ্রহণ করিল স্বচ্ছন্দ কৌতুকী॥”এমনকি ‘ভক্তিরত্নাকর’ গ্রন্থেও এই একই কথা পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হল যে, পরিণত বয়সে পৌঁছে নিত্যানন্দের সন্ন্যাসধর্ম পরিত্যাগ ও কৌমার্যভঙ্গ করবার কারণ কি ছিল? এই প্রসঙ্গে অতীতের কেউ কেউ অভিমতপ্রকাশ করেছিলেন যে, নিত্যানন্দ সন্ন্যাসীর সঙ্গে গৃহত্যাগ করলেও নিজে কিন্তু কখনও সন্ন্যাসী হননি। কিন্তু— কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থের মধ্যলীলার তৃতীয় পরিচ্ছেদে নিত্যানন্দকে স্পষ্ট ভাষাতেই — ‘তৈর্থিক সন্ন্যাসী’ — বলেছিলেন। আবার কারও কারও মতে নিত্যানন্দ নাকি শ্রীচৈতন্যের আজ্ঞাতেই বিবাহ করেছিলেন। কিন্তু— তাঁদের এই যুক্তির যথার্থ্যতা নিয়ে বর্তমান সময়ের গবেষকদের মনে প্রবল সংশয় রয়েছে।(৩) বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ (অন্ত্যখণ্ড, পঞ্চম অধ্যায়) এবং জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ (এশিয়াটিক সোসাইটি সংস্করণ, পৃ- ২২৪) গ্রন্থদ্বয় থেকে জানা যায় যে, নিত্যানন্দ নীলাচল থেকে বাংলায় প্রত্যাবর্তন করবার পরে নিজের সর্বাঙ্গে মহামূল্য রত্নালঙ্কার পরতেন; যা সেকালের বৈষ্ণবদের অনাড়ম্বর নিষ্কিঞ্চন জীবনযাত্রার সঙ্গে একদমই বেখাপ্পা ছিল। প্রশ্ন হল যে, নিত্যানন্দের এই রুচি-পরিবর্তন হওয়ার পিছনে কি কারণ ছিল?(৪) বৃন্দাবন দাস তাঁর গ্রন্থের কোথাও নিত্যানন্দের দুই স্ত্রী — বসুধা ও জাহ্নবী, দুই পুত্র — বীরভদ্র ও রামভদ্র, এবং কন্যা গঙ্গার প্রসঙ্গে কোন কথা উল্লেখ করেন নি কেন? তৎকালীন জনসাধারণ নিত্যানন্দের বিবাহ সম্বন্ধে অনুকূল মনোভাব পোষণ করতেন না বলেই কি তিনি একাজ করেছিলেন? এমনকি বৃন্দাবন দাসের অনুগামী লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজও তাঁর গ্রন্থের কোথাও নিত্যানন্দের বিবাহ-প্রসঙ্গের কোন কথা উল্লেখ করেননি বলে দেখতে পাওয়া যায়।(৫) বৃন্দাবনদাস তাঁর ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থটি রচনা করবার সময়ে বাংলায় নিত্যানন্দের প্রবল বিরোধী একদল মানুষ ছিলেন (এই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত আলোচনার জন্য ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার রচিত ‘শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান’ গ্রন্থটি দ্রষ্টব্যঃ)। তবে তাঁদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু শ্রীচৈতন্যদেবকে শ্রদ্ধা করতেন —“এই অবতারে কেহো গৌরচন্দ্র গায়।নিত্যানন্দ নাম শুনি উঠিয়া পালায়॥”এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের ভাইও চৈতন্যদেবকে ভক্তি করলেও নিত্যানন্দকে কিন্তু ভক্তি করতেন না। সেযুগের বাংলায় নিত্যানন্দের এই প্রবল বিরোধী দল ছিল বলেই ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থে বৃন্দাবনদাসকে বারবার নিত্যানন্দের মহিমাকীর্তন করতে হয়েছিল। এখানে যে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে, সেটা হল যে, চৈতন্যদেবের প্রিয়তম সহচর বলে পরিচিত নিত্যানন্দের এরকম বিরোধী দল সৃষ্ট হওয়ার পিছনে কি কারণ ছিল? নিত্যানন্দের নীলাচল থেকে বাংলায় প্রত্যাবর্তন, অলঙ্কারধারণ, বিবাহ, পুত্রকন্যার জন্ম— প্রভৃতির সঙ্গে এর কোন যোগ ছিল নাতো?বলাই বাহুল্য যে, চৈতন্যচরিতগ্রন্থগুলি থেকে এসব প্রশ্নের কোন সুস্পষ্ট উত্তর কিন্তু পাওয়া যায় না। এই প্রসঙ্গে একথাও উল্লেখ করবার দরকার রয়েছে যে, অতীতের বিশিষ্ট চৈতন্যচরিতগ্রন্থগুলির মধ্যে অধিকাংশই কিন্তু নিত্যানন্দের দলের লোকেরাই লিখেছিলেন। বৃন্দাবনদাস নিত্যানন্দের শিষ্য ছিলেন; জয়ানন্দ নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্রের প্রসাদপ্রাপ্ত ছিলেন; কৃষ্ণদাস কবিরাজ স্বপ্নে নিত্যানন্দের কৃপা পেয়েছিলেন; ‘প্রেমবিলাস’ গ্রন্থের রচয়িতার নামই নিত্যানন্দদাস ছিল, তাছাড়া তিনি নিত্যানন্দের স্ত্রী জাহ্নবী দেবীর শিষ্য ছিলেন। তাই নিত্যানন্দের প্রতিকূলে যেতে পারে, এমন বিষয়গুলিকে হয়ত তাঁরা ইচ্ছা করেই তাঁদের গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেননি বলে বর্তমান সময়ের গবেষকরা মনে করে থাকেন।চৈতন্যচরিতগ্রন্থগুলি থেকে নিত্যানন্দের নাম, ধাম ও বংশপরিচয় সম্পর্কে যাকিছু জানতে পারা যায় — সেটা এরকম। রাঢ়ের বীরভূম জেলার অন্তর্গত একচাকা গ্রামে নিত্যানন্দের বাড়ি ছিল। এই প্রসঙ্গে জয়ানন্দ তাঁর ‘চৈতন্যমঙ্গল’ গ্রন্থে লিখেছিলেন যে, নিত্যানন্দের বাড়ি ছিল — “একচাকা খলকপুরে”। একচাকা গ্রামের পাশে অবস্থিত বর্তমানের বীরচন্দ্রপুর নামক প্রসিদ্ধ গ্রামটিই অতীতে ‘খলকপুর’ নামে পরিচিত ছিল বলে গবেষকরা মনে করে থাকেন। পরে নিত্যানন্দের পুত্র বীরচন্দ্রের নামে গ্রামটির নতুন নামকরণ হয়েছিল। নিত্যানন্দের পিতার নাম ছিল — হাড়াই পণ্ডিত। ‘গৌরগণোদ্দেশদীপিকা’, দৈবকীনন্দনের ‘বৈষ্ণব-বন্দনা’ ও চূড়ামণিদাসের ‘গৌরাঙ্গবিজয়’ গ্রন্থটি থেকে জানা যায় যে, হাড়াই পণ্ডিতের প্রকৃত নাম ছিল — মুকুন্দ পণ্ডিত। মুকুন্দ বা হাড়াই পণ্ডিতের নিত্যানন্দ ছাড়াও অন্যান্য পুত্ররা ছিলেন, কারণ— এই প্রসঙ্গে বৃন্দাবনদাস লিখেছিলেন — “সকল পুত্রের জ্যেষ্ঠ নিত্যানন্দ রায়।” (মধ্যখণ্ড, ৩য় অধ্যায়) এছাড়া ‘ভক্তিরত্নাকর’ গ্রন্থের একাদশ তরঙ্গেও নিত্যানন্দের ছোট ভাইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। লোচনদাস জানিয়েছিলেন যে, নিত্যানন্দের আগের নাম ছিল — ‘কুবের’। যদিও তাঁর এই উক্তিকে গবেষকরা সত্যি বলে মনে করেন না। বৃন্দাবনদাস ও জয়ানন্দ তাঁদের গ্রন্থের কয়েক জায়গায় নিত্যানন্দকে — ‘অনন্ত’ বলে উল্লেখ করলেও, বাস্তবে সেখানে তাঁরা নিত্যানন্দকে — অনন্ত তত্ত্বরূপে — উল্লেখ করেছিলেন বলেই গবেষকরা মনে করে থাকেন।বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থের আদিখণ্ডের ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলা হয়েছিল যে, নিত্যানন্দ মাত্র বারো বছর বয়সে একজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে গৃহত্যাগ করেছিলেন —“হেন মতে দ্বাদশ বৎসর থাকি ঘরে।নিত্যানন্দ চলিলেন তীর্থ করিবারে॥তীর্থযাত্রা করিলেন বিংশতি বৎসর।তবে শেষে আইলেন চৈতন্য-গোচর॥”এথেকে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেটা হল যে, নিত্যানন্দ মাত্র বারো বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে তীর্থ-পর্যটনে বের হয়েছিলেন, এবং এর ২০ বছর বাদে চৈতন্যদেবের সঙ্গে তিনি মিলিত হয়েছিলেন। চৈতন্যদেব তখন গয়া থেকে নবদ্বীপে ফিরে লীলা-কীর্তন সুরু করেছিলেন। কিন্তু— এই একই প্রসঙ্গে জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ গ্রন্থের নদীয়াখণ্ডের চতুর্থ অধ্যায়ে (এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ‘Jayananda’s Caitanya-mangala’ গ্রন্থের ১৩ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্যঃ) লেখা হয়েছিল যে, নিত্যানন্দ —“অষ্টাদশ বৎসরে ছাড়িল গৃহবাস॥”বাংলা রীতি অনুযায়ী সতেরো বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘অষ্টাদশ বৎসর’ বয়স শুরু হয়। অতীতে ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার তাঁর ‘শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান’ গ্রন্থে আলোচ্য বিষয় সম্বন্ধে বৃন্দাবনদাসের উক্তিকেই অভ্রান্ত বলে প্রতিপন্ন করেও নিজের মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি লিখেছিলেন —“Vindāvanādāsa (Adi Kh., VIII) tells at one place that Nityananda was twelve years of age when he went out on pilgrimage; but at another place (Madhya Kh., III) he relates that the Sannyasin with whom he went, begged his father to allow the son to accompany him as there was no good Brahmana with him. This implies that the Sannyasin was in search of a person who would be able to cook his food and perform the priestly duty. Jayānanda says that Nityananda was eighteen years old when he left his home (Nadiya Kh., IV. 5). A young man of eighteen would be more suitable for the purposes of the Sannyasin than a boy of twelve.”বর্তমান সময়ের গবেষকরাও ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার ও জয়ানন্দের উক্তিকেই এক্ষেত্রে সঠিক বলে মনে করে থাকেন। একইসাথে এই সূত্র ধরেই নিত্যানন্দের জন্মের সঠিক তারিখটিও জানতে পারা গিয়েছে।গবেষকদের মতে নিত্যানন্দ মহাপ্রভু মাঘ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে বৃন্দাবন দাস তাঁর ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থের আদিখণ্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়ে লিখেছিলেন —“নিত্যানন্দ-জন্ম মাঘ শুক্লা ত্রয়োদশী।”এছাড়া অন্যান্য বহু চৈতন্যচরিতগ্রন্থেও নিত্যানন্দের এই একই জন্মতিথির উল্লেখ পাওয়া যায়। উদারণস্বরূপ বলা চলে যে, অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রজমোহন দাস নামের একজন কবির লেখা ‘চৈতন্যতত্ত্বপ্রদীপ’ নামের একটি অপ্রকাশিত চৈতন্যচরিতগ্রন্থের পুঁথি (পুঁথি নং— ১৬৭৩) সংরক্ষিত ছিল। সেই ‘চৈতন্যতত্ত্বপ্রদীপ’ গ্রন্থটির এক জায়গায় (৪৫ ক পৃষ্ঠা) নিত্যানন্দের জন্মতিথিটি বার-সমেত যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, সেভাবে অন্য কোথাও করা হয়নি —“নিত্যানন্দ একচাকা খলতপুরতে।হাড়ো পণ্ডিতের ঘরে প্রসিদ্ধ জগতে॥জনম লভিল পদ্মাবতির উদরে।মাঘে শুরু ত্রয়োদশি ভূমিসুতবারে॥”স্বামী কানু পিল্লাই লিখিত ‘Indian Ephemeris’ গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ১৪৮ নং পৃষ্ঠায় দেখতে পাওয়া যায় যে, ১৩৯৪ শকাব্দের মাঘ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশী তিথি সত্যিই — ভূমিসুতবার — অর্থাৎ, মঙ্গলবারে পড়েছিল। ইংরেজি হিসেবে সেই তারিখটি হয় — ১৪৭৩ খৃষ্টাব্দের ১২ই জানুয়ারি। নিত্যানন্দ সেই তারিখেই জন্মগ্রহণ করে থাকলে তাঁর জীবনের অষ্টাদশ বর্ষ ১৪১১ শকাব্দের মাঘী শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে শুরু হয়েছিল। সুতরাং তিনি যদি তাঁর জীবনের অষ্টাদশ বর্ষে গৃহত্যাগ করে থাকেন, এবং তারপরে— ‘বিংশতি বৎসর’ তীর্থ পর্যটন করে চৈতন্যদেবের লীলা-কীর্তনের বছরে নবদ্বীপে পৌঁছে তাঁর সাথে মিলিত হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি ১৪১১ + ২০ = ১৪৩১ শকাব্দে চৈতন্যদেবের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, ওই ১৪৩১ শকাব্দেই, অর্থাৎ— ১৫০৯-১০ খৃষ্টাব্দে চৈতন্যদেব নবদ্বীপে লীলা-কীর্তন করেছিলেন।তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, নিত্যানন্দের গৃহত্যাগ করবার বয়স সম্পর্কে জয়ানন্দই সঠিক উক্তি করেছিলেন, এবং নিত্যানন্দ মহাপ্রভু ১৪৭৩ খৃষ্টাব্দের ১২ই জানুয়ারি তারিখেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নিত্যানন্দ যদি বারো বছর বয়সে গৃহত্যাগ করতেন, তাঁর ১৫০০ শকাব্দের মাঘী শুক্লা ত্রয়োদশী তিথিতে তাঁর জন্ম হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু— সেই বছরে ঐ তিথি মঙ্গলবারে পড়েনি।বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থে নিত্যানন্দের তিরোধানের সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় এবং গবেষকদের মতে ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থটির রচনাসমাপ্তিকালের অধস্তন সীমা হল ১৫৫০ খৃষ্টাব্দ। অতএব— নিত্যানন্দের তিরোধানের নিম্নতম সীমাকে ১৫৪৫ খৃষ্টাব্দ বলে ধরা যেতে পারে।ইতিহাস বলে যে, মহাপ্রভু যখন নবদ্বীপ ত্যাগ করে নীলাচলে গিয়েছিলেন, তখন নিত্যানন্দও তাঁর সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন। তারপরে কোন একসময়ে মহাপ্রভু নিত্যানন্দকে সেখান থেকে গৌড়ে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে কৃষ্ণদাস কবিরাজ জানিয়েছিলেন যে, মহাপ্রভু দক্ষিণ ভারত থেকে ফিরে আসবার পরে রথযাত্রা উপলক্ষ্যে বাংলা থেকে তাঁর ভক্তরা যখন নীলাচলে গিয়েছিলেন, তখনই মহাপ্রভু নিত্যানন্দকে গৌড়ে ফিরে যাওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু— গবেষকদের মতে তাঁর একথা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ— বৃন্দাবন দাস তাঁর গ্রন্থে (২।১৫) জানিয়েছিলেন যে, দক্ষিণ ভারত থেকে ফিরে আসবার পরে মহাপ্রভু নিজেই প্রথমে গৌড়ে এসেছিলেন, এবং এরপরে গৌড় থেকে নীলাচলে ফিরে যাওয়ার পরে মহাপ্রভু নিত্যানন্দকে গৌড়ে ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন। বৃন্দাবন দাস যেহেতু নিত্যানন্দের প্রিয় শিষ্য ছিলেন এবং নিত্যানন্দের কাছ থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থটি লিখেছিলেন, সেহেতু এই বিষয়ে তাঁর উক্তিকেই গবেষকরা কৃষ্ণদাসের থেকে বেশি প্রামাণিক বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু বৃন্দাবন দাস যেহেতু তাঁর গ্রন্থে মহাপ্রভুর বৃন্দাবন ভ্রমণের বর্ণনা দেননি, কাজেই নিত্যানন্দের গৌড়ে প্রত্যাবর্তন করবার ঘটনাটি মহাপ্রভুর বৃন্দাবন থেকে নীলাচলে ফিরে যাওয়ার পরে ঘটেছিল কিনা, সেটা বৃন্দাবন দাসের লেখা থেকে বুঝতে পারা যায় না। কিন্তু— সেই সময়কার চৈতন্যলীলার প্রত্যক্ষদর্শী মুরারি গুপ্ত লিখেছিলেন যে (৪।২২), বৃন্দাবন থেকে নীলাচলে ফিরে আসবার পরেই মহাপ্রভু নিত্যানন্দকে গৌড়ে ফেরৎ পাঠিয়েছিলেন। সুতরাং— ১৪৩৭ শকাব্দ বা ১৫১৫ খৃষ্টাব্দের অল্প পরেই মহাপ্রভু যে নিত্যানন্দকে গৌড়ে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, সেবিষয়ে বর্তমান সময়ের গবেষকদের মনে কোন সন্দেহ নেই।

Share this content:
