–রানা চক্রবর্তী

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর রহস্যজনক অন্তর্ধানের পরে নিত্যানন্দ অবধূতকে বাংলার গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজের নেতা বলে গণ্য করা হয়েছিল। নিজের বিভিন্ন কার্যকলাপের ফলে অত্যন্ত বিতর্কিত এই চৈতন্য-অনুচর সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত ইতিহাস থেকে যতটুকু তথ্য উদ্ধার করা গিয়েছে, তা থেকে জানা যায় যে, মধ্যযুগের বাংলার এক রাঢ়ী ব্রাহ্মণ বংশে তাঁর জন্ম হয়েছিল। ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থের মধ্যলীলা অংশের ১৫তম পরিচ্ছেদ এবং ‘ভক্তিরত্নাকর’ গ্রন্থের ৫৩৭নং পৃষ্ঠায় প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, বাংলায় গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রচারের বিষয়ে পুরীতে নিত্যানন্দের সঙ্গে চৈতন্যের নিভৃতে কয়েক দিন ধরে আলোচনা হওয়ার পরে মহাপ্রভুর নির্দেশে তিনি বাংলায় চলে এসেছিলেন। আর বাংলায় এসেই তিনি প্রথমে সূর্য্য সরখেলের কন্যা বসুধাদেবীকে বিবাহ করেছিলেন। এসময়ে যদিও উপবীত ত্যাগ করা একজন ব্রাহ্মণকে নিজের কন্যা দান করতে সূর্য্য সরখেলের যথেষ্ট আপত্তি ছিল, কিন্তু তবুও শেষপর্যন্ত এই বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু এই বিবাহের পরেই নিত্যানন্দ এমন একটি কাজ করেছিলেন, যা তাঁকে অত্যন্ত বিতর্কিত করে তুলেছিল। নিত্যানন্দ দাস রচিত ‘প্রেমবিলাস’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, বসুধাদেবীকে বিবাহ করবার পরে একদিন নিত্যানন্দ যখন নিজের শ্বশুরবাড়িতে আহার গ্রহণ করছিলেন, তখন তাঁর শ্যালিকা জাহ্নবীদেবী তাঁকে আহার পরিবেশন করতে এলে দুর্ঘটনাবশতঃ তাঁর অবগুণ্ঠন খুলে গিয়েছিল। আর নিত্যানন্দও তৎক্ষণাৎ জাহ্নবীদেবীর হাত ধরে তাঁকে নিজের ডানদিকে বসিয়ে শ্বশুরকে বলেছিলেন—‘তোমার এই মেয়েকেও আমি নিলাম’। তবে এখানেই শেষ নয়, বরং নিত্যানন্দের বিবাহ বিষয়ে আরও অনেক বিতর্ক রয়েছে। এমনকি অতীতে লালমোহন বিদ্যানিধি তাঁর ‘সম্বন্ধ নির্ণয়’ নামক গ্রন্থে জানিয়েছিলেন যে, নিত্যানন্দের নাকি আরও একজন স্ত্রী ছিলেন।তবে বিবাহ বিষয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, একথা কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যি যে, নিত্যানন্দের সবধরণের কাজই সেযুগের ব্রাহ্মণদের আচারের প্রতিকূল ছিল। বস্তুতঃ তিনি যেভাবে সেকালের ব্রাহ্মণদের বিরোধিতা করেছিলেন, তেমন কিছু স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভুও করতে পারেন নি। কিন্তু অবধূত হয়েও পুনরায় সংসারে প্রবেশ করবার ফলে তাঁর ‘বান্তাসী’ দোষ হয়েছিল। এছাড়া নিত্যানন্দ কোনদিনই সেযুগে প্রচলিত থাকা জাতিগত স্পর্শদোষ মানেন নি। ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থের মধ্যখণ্ডের ২৪।৮২নং শ্লোক থেকে জানা যায় যে, তিনি সকলের বাড়িতেই আহার গ্রহণ করতেন—‘হেন জাতি না খাইল যার ঘরে’।অন্যদিকে চৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাসী হওয়ার পরেও সেযুগের ব্রাহ্মণদের আচার রক্ষা করে চলতেন বলে তাঁর হাতে সবসময় একটি দণ্ড থাকত বলে জানা যায়। কিন্তু এরপরে তিনি যখন উড়িষ্যায় যাচ্ছিলেন, তখন নিত্যানন্দ রাস্তাতেই তাঁর হাত থেকে এই দণ্ডটি কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হল যে, মহাপ্রভুর হাতে থাকা এই দণ্ডটি আসলে কি ছিল? এটা কি কোন সাধারণ লাঠি ছিল, নাকি দশনামী দণ্ডীস্বামীদের দণ্ড ছিল? প্র্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, এরমধ্যে শেষোক্তটি তখন দণ্ডীদের ব্রাহ্মণবংশে জন্ম বলে পরিচয় প্রদান করত। অতীতে স্বামী বিবেকানন্দ এপ্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন যে, শঙ্করাচার্য্য কিন্তু এই রীতির প্রবর্তন করেন নি, বরং এটা আসলে সেযুগের দণ্ডীদের ব্রাহ্মণাভিমানেরই প্রতীক ছিল। সুতরাং চৈতন্যের দণ্ড যদি সেযুগের দণ্ডীদের মত ছিল, তাহলে বলা যেতে পারে যে, নিত্যানন্দ এটিকে ভেঙে দিয়ে তখন আসলে চৈতন্যের ব্রাহ্মণ-বংশের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিতে চেয়েছিলেন।তবে নিত্যানন্দই সেযুগের গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের মধ্যে সর্ববিষয়ে সংস্কারক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, এবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, যখন ব্রাহ্মণরা তাঁর সঙ্গে উদ্ধারণ দত্তকে দেখে প্রশ্ন করেছিলেন যে—‘এই লোকটি কে? এঁর পূর্ব্বাশ্রমের কি নাম ছিল?’ তখন নিত্যানন্দ উদ্ধারণের পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁদের জানিয়েছিলেন—‘ইনি কখনও রাঁধেন, আমি কখনও রাঁধি, এবং উভয়ে খাই।’ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে, এত ব্রাহ্মণ বিরোধিতা সত্ত্বেও নিত্যানন্দ তাঁর কন্যার বিবাহ কিন্তু ব্রাহ্মণ বংশেই দিয়েছিলেন। নিত্যানন্দ দাস তাঁর ‘প্রেমবিলাস’ নামক গ্রন্থের ২৪৯নং পৃষ্ঠায় জানিয়েছিলেন যে, নিত্যানন্দের একমাত্র কন্যা গঙ্গার সঙ্গে বারেন্দ্র কুলজাত এক ব্রাহ্মণের বিবাহ হয়েছিল।তবে ব্রাহ্মণ বিরোধিতা করা ছাড়া নিত্যানন্দের জীবনের সবথেকে বড় কাজ ছিল যে, তিনি খড়দহে কয়েশো ন্যাড়া-নেড়িকে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। কিন্তু এবিষয়েও কিছু বিতর্ক রয়েছে; কারণ, অতীতের কেউ কেউ জানিয়েছিলেন যে, নিত্যানন্দ নাকি এঁদের সরাসরি দীক্ষা দেননি, বরং তাঁর পুত্র বীরচন্দ্রই এঁদের দীক্ষা দিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হল যে, এই ন্যাড়া-নেড়ির দল আদতে কারা ছিলেন? অতীতে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবিষয়ে মতপ্রকাশ করেছিলেন যে, এঁরা বৌদ্ধ সহজযান সম্প্রদায়ভুক্ত ন্যাড়া-চার্য্যের দল ছিলেন। এপ্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন যে, মধ্যযুগে মুসলমানেরা যখন বাংলার জনসাধারণকে নিজেদের দলে টেনে নিচ্ছিলেন, এবং অন্যদিকে ব্রাহ্মণরা ব্রাহ্মণ্যবাদীয় ধর্মের বাইরে থাকা মানুষদের অভিশপ্ত করে তাঁদের সামাজিক নিপীড়ন করছিলেন, তখন সবধরণের রাজশক্তির সাহায্য থেকে বঞ্চিত বৌদ্ধ, নাথপন্থী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষেরা হয় ইসলাম, আর না হয় নব-সংস্থাপিত নব-বৈষ্ণবধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। আর নিত্যানন্দের সময়ে ন্যাড়া-নেড়িদের বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ আসলে এই ঘটনারই ঐতিহাসিক পরিচয় দেয়।যদিও এটা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, পুরীতে নিত্যানন্দের সঙ্গে চৈতন্যের কি কথাবার্তা হয়েছিল, এবিষয়ে কোন গ্রন্থেই তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না, কিন্তু তবুও এর ফলস্বরূপ দেখতে পাওয়া যায় যে, নিত্যানন্দ তাঁর সময়কার বাংলার এই নব-প্রতিষ্ঠিত বৈষ্ণবসম্প্রদায়,—যেখানে তখন ব্রাহ্মণদের সংখ্যাই বেশি ছিল, বৈদ্যরা তাঁদের নীচে ছিলেন, এবং কায়স্থদের সংখ্যা অতি মুষ্টিমেয় ছিল,—সেই গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। আর তাঁর পরে এই দরজা আর কখনো কারো জন্য রুদ্ধ হয়নি। এরফলে যেসব জায়গায় তখন ব্রাহ্মণেরা পৌঁছাতে পারেননি, বৈষ্ণব ধর্মপ্রচারকেরা সেখানে অনায়াসে পৌঁছেছিলেন, এবং তাঁদের সক্রিয় প্রচেষ্টায় পশ্চিমবাংলায় বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা তখন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, অতীতে রাজা রামমোহন রায়, শিশিরকুমার ঘোষ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখ প্রত্যেকেই জানিয়েছিলেন যে, বাংলার বেশিরভাগ কায়স্থ, ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য যেখানে শাক্ত, সেখানে অন্যান্য জাতিগুলির বেশিরভাগই গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত। আবার কিছু গবেষকের মতে, অতীতে পাল ও সেন বংশের দরবারী শ্রেণীর মানুষেরা, অর্থাৎ—সেযুগের অভিজাতেরা হয় মহাযানপন্থী বৌদ্ধ ছিলেন, আর না হয় তান্ত্রিক ছিলেন। ফলে পরবর্তীসময়ে তাঁদের বংশধরদের অনেকেই শাক্ত হয়েই থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু মধ্যযুগের বাংলার যেসব সহজযানী, হীনযানী ও নাথপন্থী মানুষেরা ইসলাম গ্রহণ করেননি, পরবর্তীকালে তাঁদের বংশধরেরা গৌড়ীয় বৈষ্ণবসম্প্রদায়ের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। আর এই কাজটা তখন নিত্যানন্দের মাধ্যমেই ব্যাপকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। বস্তুতঃ তিনি না থাকলে চৈতন্য-পরবর্তীসময়ের বাংলায় গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম কতটা এগোতে পারত, এবিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।আর খুব সম্ভবতঃ একারণেই শত বিতর্ক সত্ত্বেও নিত্যানন্দকে তাঁর ভক্তরা ‘পতিত পাবন’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। আসলে তিনি নিজের জীবনের প্রত্যেকটি বিষয়ে ব্রাহ্মণদের বিপক্ষতাচরণ করে সবাইকে নিজের দিকে টেনে আনতে পেরেছিলেন। সুতরাং এদিক থেকে তাঁকে অনায়াসে হিন্দু-বাংলার প্রথম সমাজ-বৈপ্লবিক বলা যেতে পারে।

IMG-20251124-WA0000 ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মে নিত্যানন্দের অবদান’

Share this content:

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x